Skip to main content

ঢাকা বিভাগ এর গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণ


ঢাকা বিভাগ এর গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণ





গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণঃ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় গৃহীত সাক্ষাৎকার


হত্যা, ধ্বংস ও নির্যাতনের বিবরণ

|| ঢাকা বিভাগ ||


।। ১ ।।

শ্রীমতী বাসন্তী রাণী গুহঠাকুরতা,

স্বামী ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা

প্রধান শিক্ষয়িত্রী, মনিজা রহমান গার্লস হাইস্কুল,

গেণ্ডারিয়া, ঢাকা-৪



১৯৭১ সনের ২৫ শে মার্চ সেই কালরাতে আমরা স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিনের মত খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই রাত নয়টার সময় রেডিও খুলে বসে ছিলাম। ঢাকা রেডিও থেকে আমরা সে রাতে দূর্যোগের কোন পূর্বাভাস পাই নাই। ভয়েস অব আমেরিকা-এর সংবাদ শুনে আমার স্বামী ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা মেয়ে ‘মেঘনার’ ঘরে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ. প্রিলিমিনারী এবং অনার্স পরীক্ষার্থীদের খাতা দেখতে বসলেন। অকস্মাৎ জনতার দুপদাপ শব্দ শুনে আমার স্বামী এবং আমি দেওয়ালের বাইরে গিয়ে দেখলাম, জনতা রাস্তায় রাস্তায় বড় বড় গাছ, পানির ট্যাঙ্ক ও ইট-পাটকেল দিয়ে প্রতিরোধ তৈরি করছে। আমার স্বামী বিপদ বুঝতে পেরে আমাদের ফ্ল্যাটের প্রবেশপথ তালাবদ্ধ করেন। আমার স্বামী রাস্তার দিকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে ভারাক্রান্ত মনে “বিপদ আরম্ভ হয়ে গেল” বলে আবার মেয়ের কক্ষে গিয়ে খাতা দেখতে বসে গেলেন। আমি আজেবাজে চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। রাত বারটার দিকে অদূরে বোমার আওয়াজ শুনে জেগে উঠে দেখলাম, ইকবাল হল এবং রোকেয়া হলের দিক থেকে বোমার আওয়াজ ভেসে আসছে। আস্তে আস্তে অসংখ্য লাইট বোমা আকাশকে আলোকিত করে দিচ্ছে, আলোর ফুলকিতে দেখলাম বোমা ও গুলি বর্ষিত হচ্ছে। আমরা দু’জন গুলি ও বোমার কানফাটা আওয়াজ সহ্য করতে না পেরে খাটের তলায় বেড কভার বিছিয়ে নিরাপদে শুয়ে বর্বর পাক সেনাদের বীভৎসতার তাণ্ডব শুনছিলাম। পাশের কামরা থেকে আমাদের ঝিকে ডাকতে গেলে সে আসে না-আমরা সবাই গুলির অবিরাম গর্জনে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমাদের ফ্ল্যাটটি কাঁপছিল-চারিদিকে দেখলাম লাইট বোমের আলোর ঝলকানি। হিস হিস শব্দ শুনে আমার গায়ের লোম শিউরে উঠলো-আমি উঠে গিয়ে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম-আমার ফ্ল্যাটের প্রবেশপথের সামনে পাক সেনা-ভারী অস্ত্রবাহী সশস্ত্র আর্মী ট্রাক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে-অল্পক্ষণ পরেই এক পাঞ্জাবী মেজর আমার গেটের লোহার জিঞ্জির হাত দিয়ে সজোরে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে আমার মেয়ে মেঘনার কক্ষের জানালার মসকুইটো নেট বেয়নেট দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে মাথা ঢুকিয়ে আমাকে দেখে এক দৌড় দিয়ে ঘুরে রান্নাঘরের দরজা ভেঙ্গে আমাদের ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে। আমি আমার স্বামীকে বললাম পাক সেনারা আমাদের ফ্ল্যাট ঘেরাও করেছে- আমরা বিপদগ্রস্ত, বিপন্ন। আমার স্বামী আমার মেয়েকে অন্য কামরায় গিয়ে শুয়ে থাকতে বললেন, পাঞ্জাবী সৈন্যরা আমাদের কামরার দরজায় বুটের লাথি মারছিল। আমি দৌড়ে গিয়ে আমার স্বামীকে বললাম, পাক সেনারা এসে গেছে, হয়তো তোমাকে গ্রেফতার করবে, তুমি তৈরি হয়ে নাও, বলে একটি পাঞ্জাবী তার হাতে দিয়ে মেয়েকে নিয়ে ঘরে এসে দেখলাম- রান্নাঘরের পাশে বারান্দার দরজা দিয়ে প্রবেশ করে আমার ‘আয়াকে’ কনুইয়ের আঘাতে সজোরে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে আমার সামনে এসে জিজ্ঞাসা করলো “প্রফেসর সাহাব হায়?” আমি নিরুপায় হয়ে সত্য কথা বললাম, “হায়”। পাঞ্জাবী মেজর আবার বললো, উনকো লে যায়েগা। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “কাহা লে যায়েগা?” আমার কথার সন্তোষজনক উত্তর না দিয়ে অত্যন্ত অবজ্ঞার সুরে বললো, “লে যায়েগা।” আমার সাথে সাথে মেজর চলতে চলতে বলতে লাগলো, “ফ্লাটমে আওর কই জোয়ান আদমী হায়?” আমি বললাম-“নাহি, ত হামারা একহী লাড়কি হায়।” একথা শুনে মেজর বললো, “ঠিক হায়, লাড়কি কা ডার নাহি হায়”-আমার সাথে যে কামরায় ছিলেন সেই কামরায় প্রবেশ করে আমার স্বামী ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে বাম হাত চেপে ধরে জিজ্ঞাসা করলো, “আপ প্রফেসর সাহাব হায়?” আমার স্বামী ইংরেজীতে বললেন, “ইয়েস”। পাঞ্জাবী মেজর বললো, “আপকো লে যায়েগা”। আমার স্বামী মোটা গলায় অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বললেন, “হোয়াই?” মেজর তার প্রশ্নের কোন জওয়াব না দিয়ে টেনে বাইরে নিয়ে গেল- তাদের আমি পিছনে পিছনে কিছুদূর গিয়ে তাদেরকে আর দেখতে না পেয়ে কামরায় ফিরে এসে টেলিফোনের রিসিভার উঠিয়ে দেখলাম সবকিছু বিকল অচল হয়ে আছে। আমি এ সময় সবই বুঝতে পারলাম-আমরা বিপদগ্রস্ত, বিপন্ন। ফিরে দেখলাম-উপর তলার সিঁড়ির শেষ মাথায় মিসেস মনিরুজ্জামানকে পাঞ্জাবী জোয়ানরা “যাও, যাও, হাঁটো” বলে তাড়া দিচ্ছে। ইতিপূর্বেই পাকসেনারা ড. মনিরুজ্জামান, তার ছেলে, তার ভাগনে এবং প্রতিবেশী যুবককে টানাটানি করে ঠেলে ধাক্কিয়ে ধাক্কিয়ে নিচে নামিয়ে নিয়ে আসার জন্য জোরাজুরি করছিল। মিসেস জামান সিঁড়ির শেষ মাথায় এসে আমাকে বললেন, পাকসেনারা ওদের সবাইকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি তাকে বললাম-নিয়ে যেতে দিন, ওদেরকে বাধা দিয়ে লাভ নাই- ওরা আমাদের ভাষা বুঝে না-জোরাজুরি করলে মেরে ফেলতে পারে। এ কথা বলতে বলতে বাইরে আমি দুটি গুলির আওয়াজ শুনে দৌড়ে বালিশ হাতে অদূরে দাঁড়ানো মেয়েকে ধরতে গিয়ে পরপর আটটি গুলির শব্দ শুনে অগ্রসর হয়ে দেখলাম-সিঁড়ির নিচে চারজনের দেহ গড়াগড়ি যাচ্ছে। গুলিবর্ষণ করার পরক্ষণেই পাকসেনারা সবাইকে কার্ফু জারীর কথা ঘোষণা করে, দ্রুত ট্রাকগুলি নিয়ে চলে গেল। মিসেস মনিরুজ্জামান তেতলা থেকে পানি নিয়ে এসে গুলিবিদ্ধ সবাইকে খাওয়ালেন-তিনি দৌড়ে এসে বললেন “দিদি আপনার সাহেব গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছেন, আমার সাথে কথা বলছেন, তিনি বাঁচবেন।“ একথা শুনে আমি এবং আমার মেয়ে “মেঘনা” দৌড়ে আমার স্বামীর গুলিবিদ্ধ দেহের সামনে উপস্থিত হয়ে দেখলাম- আমার স্বামীর দেহ গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছে। তিনি বলছিলেন, “ওরা আমাকে গুলি করেছে, আমার শরীর প্যারালাইসিস হয়ে গেছে। আমাকে তুলে ঘরে নিয়ে যাও।” আমি কান্নার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম শুধু হায় হায় শব্দ করছিলাম। দোতলার যে ফ্ল্যাটে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক সাহেব এবং অধ্যাপক আনিস সাহেব থাকতেন তাদের ব্লকের প্রবেশপথে অটোমেটিক তালা ঝুলতে থাকায় পাকসেনারা সেখানে প্রবেশ করে নাই। পাকসেনারা চলে যাওয়ার পরও ওরা কেউ আমাদের অসহায় চিৎকার শুনেও আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে নাই। আমরা কোন রকমে আমার স্বামীর রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত দেহ ধরাধরি করে আমাদের ফ্ল্যাটে নিয়ে এসে বারান্দার খাটে এলিয়ে দিলাম-আমার স্বামী জ্ঞান হারান নাই তখনও। আমার মেয়ে “মেঘনা” মনিরুজ্জামান সাহেবের ভাগনের পানি পানি বলে অসহায় আর্তনাদ শুনে আমাকে নিয়ে তার মুখে শেষ পানি দিয়ে আসলো। পরক্ষণেই ছেলেটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।



দূরে-অদূরে বৃষ্টির মত অবিরাম গুলি বর্ষণ করছিল পাকসেনারা। কিছুক্ষণ পরে দেখলাম পাকসেনারা জগন্নাথ হলের পূর্বদিকে ছাত্রদের কেন্টিনে আগুন লাগিয়ে দেয়- মাঝে মাঝে পাকসেনাদের সামরিক ট্রাকগুলি টহল দিচ্ছিল, চারিদিকে শ্মশানের হাহাকার।



পরের দিন ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ এবং ২৭শে মার্চ সকাল পর্যন্ত আমার স্বামীর ক্ষত বেয়ে রক্ত ঝরছিল-বাইরে সান্ধ্য আইন বলবৎ থাকায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে তার চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা করতে পারি নাই।



১৯৭১ সনের ২৭শে মার্চ সকালে কতিপয় লোকের সাহায্যে আমার স্বামীকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করি। হাসপাতালে কোন লোকজন ও ডাক্তার ছিল না। দায়িত্বরত নার্সরা সাধ্যমত আমার স্বামীর সেবাযত্ন করেছে।



১৯৭১ সনের ৩০শে মার্চ বিনা চিকিৎসায় আমার স্বামী মৃত্যুবরণ করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর আমি তার মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে সরিয়ে আনার অনুমতি পাই নাই- তার পবিত্র মৃতদেহের সৎকার করতে পারি নাই। আমার স্বামীর মৃত্যুর পরক্ষণেই পাকসেনারা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ঘেরাও করে- আমি স্বামীর মৃতদেহ নিয়ে আসার কোন উপায় না দেখে ডাক্তারদের উপদেশে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর ড. মালেকের বড় ভাই আব্দুল বারি সাহেবের স্ত্রীর সাথে তাদের গাড়ীতে আমাদের স্কুলের সেক্রেটারী ড. এম.এ. ওয়াহিদ সাহেবের ২০ নং ধানমণ্ডিস্থ বাসায় আশ্রয় লাভ করি। আমার স্বামীর লাশ চারদিন হাসপাতালে পড়েছিল-আমার ড্রাইভার ৩রা এপ্রিল পর্যন্ত হাসপাতালের ওয়ার্ডের বারান্দায় আমার স্বামী ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মৃতদেহ দেখে এসেছে।



স্বাক্ষর

বাসন্তী গুহঠাকুরতা

২০-৫-১৯৭৪




।। ২ ।।


ডঃ মোহাম্মদ আজহার আলী

সহকারী অধ্যাপক

প্রাইমারী শিক্ষা বিভাগ

শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সিটিউট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।



১৯৭১ সনের ২৫ শে মার্চ আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফ কোয়ার্টারের ১৪/এইচ ফ্লাটে সপরিবারে অবস্থান করছিলাম। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার্স ক্লাবে অন্যান্য বিভাগের অধ্যাপকদের সাথে বসেছিলাম। রাত নয়টার সময় প্রতিদিনের মত স্বাভাবিকভাবে আমরা ক্লাব ছেড়ে যার যার ফ্লাটে চলে গিয়েছিলাম। খাওয়া দাওয়া করে আমরা সবাই শুয়ে পড়েছিলাম। রাত আনুমানিক বারটার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস ও স্টাফ কোয়ার্টারের চারদিক থেকে অকস্মাৎ বৃষ্টির মত অবিরাম গুলিবর্ষণের শব্দ শুনে জেগে উঠি। চার তলার অপর পাশে ব্যবসা প্রশাসন বিভাগের অফিস সেক্রেটারি মিঃ মনসুর আহমেদ সাহেব সপরিবারে অবস্থান করছিলেন। আমি, আমার স্ত্রী, আমার আড়াই বছরের ছেলেটি এবং আমার ভাতিজা, কাজের ছেলে সবাই আমরা অবিরাম গুলিবর্ষণের বিভীষিকাময় শব্দে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে বসেছিলাম। সারারাত আমরা গুলিবর্ষণের আওয়াজ শুনেছি। সারারাত আমরা দরজা-জানালা বন্ধ করে বসেছিলাম-



১৯৭১ সনের ২৬ শে মার্চ সকাল ছয়টায় গুলিবর্ষণের গতি কমে গিয়েছিল। কাঁচের ফাঁক দিয়ে দেখলাম-সশস্ত্র পাঞ্জাবী সেনারা আমাদের এলাকার প্রবেশ পথ দিয়ে অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। পাঞ্জাবী সেনারা ১১ এবং ১২ নম্বর ফ্লাটে প্রবেশ করে এলাপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করতে থাকে। এসময়য় আমরা ফ্লাটের নীচে অবস্থানকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী মেডিকেল অফিসার ডাঃ মুর্তজা স্টেথোস্কোপ গোলায় রেখে বাইরে পায়চারী করছিলেন। পাঞ্জাবী সেনারা ডাঃ মুর্তজাকে ও অন্যান্য আরও তিনজনকে ১২ নং ফ্লাট থেকে লাশ তুলে বাহিরে নিয়ে রাখার নির্দেশ দান করে। ডাঃ মুর্তজাকে অন্যান্য লোকজনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ মোকতাদির সাহেবের লাশ বের করতে দেখলাম। ইহার পর পাক সেনারা ১১ নং ফ্লাটে প্রবেশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেবরেটরী স্কুলের শিক্ষক মোহাম্মদ সাদেককে হত্যা করে। সাদেক সাহেবের লাশ পাক সেনারা ফেলে রেখে যায়। বিকাল চারটার সময় সাদেক সাহেবের পরিবার আমাদের ফ্লাটে চলে আসে।



২৬ শে মার্চ সারাদিন সারারাত আমরা যার যার ফ্লাটে আটকা পড়েছিলাম। ২৭ শে মার্চ সকালে কার্ফূ উঠিয়ে নিলে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে সবাই নিরাপদ স্থানে যেতে থাকে। ১১ নং ফ্লাটের নীচতলায় সাদেক সাহেবের লাশ পড়েছিল। বিভিন্ন ফ্লাট থেকে ফ্রীজের পানি এনে লাশের উপর দেওয়া হয়। সাদেক সাহেবের স্ত্রী, শ্যালক, ভাই, চার ছেলেমেয়ে লাশের চারদিকে দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করছিল। আমি আমার এবং সাদেক সাহেবের পরিবার অন্যত্র সরিয়ে রেখে ১১ নং ফ্লাটের দক্ষিণ পার্শ্বে সাদেক সাহেবের লাশ সমাহিত করি।



স্বাক্ষর/- মোঃ আজহার আলী ৮-৬-৭৪



।। ৩ ।।

ইব্রাহিম ভুইয়া

লাইব্রেরীয়ান, শিক্ষা ও গবেষণা ইনষ্টিটিউট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।



১৯৭১ সনের সেপ্টেম্বর মাসে আমি গ্রামের বাড়ী যাওয়ার জন্য ঢাকা সদরঘাটের দিকে রওয়ানা হয়েছিলাম। সদর ঘাট টার্মিনালের প্রবেশ পথে পাঞ্জাবী সেনাদের প্রহরায় মোতায়েন দেখলাম। কিছুক্ষন পরে এক অতি বৃদ্ধ ভদ্রলোক মুন্সিগঞ্জ যাওয়ার জন্য টার্মিনালে আসলেন। সঙ্গে তার নবপরিণীতা পুত্রবধূ এবং যুবতী মেয়ে ছিল। পাঞ্জাবী সেনারা আমাদের সবাইকে তল্লাশি করতে বললো “ইয়ে দো আওরাত নাহি যায়েগী”। বৃদ্ধ নিরুপায় হয়ে কান্নাকাটি করে সামনে যাকে পায় তাকেই জড়িয়ে ধরে বলতে থাকেন, “আপনারা আমার মেয়ে ও পুত্রবধূকে বাঁচান।” কিন্তু আমাদের কিছুই করার ছিল না। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমরা সেই অসহায় যুবতী মেয়ে দু’জনকে রক্ষা করার জন্য কোন কথা বলতে পারি নাই, কিছুই করতে পারি নাই। আমাদের সকলের চোখের সামনে পাঞ্জাবী সেনারা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে যুবতী মেয়ে দু’টিকে টেনে হিঁচড়িয়ে ওদের আর্মি ট্রাকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। মেয়ে দু’টি এসময় করুন আর্তনাদে ভেঙ্গে পড়েছিল। দু’ঘন্টা পড় আবার যুবতী মেয়ে দু’টিকে ফিরিয়ে নিয়ে এল। দেখলাম, মেয়ে দুটির চলার কোন শক্তি নাই, এলোমেলো চুল, অশ্রুভরা মুখমণ্ডল। আমরা লঞ্চে রওয়ানা হয়ে গেলাম।



‘পাগলার’ এম, এম ওয়েল পার্ক আর্মি ঘাটিতে আমাদের লঞ্চ আটকিয়ে তল্লাশী চালানো হয়-পাক সেনারা যাত্রীদের মুল্যবান মামালাম লুট করে নিয়ে যায়। লঞ্চে দাঁড়িয়ে আমরা দেখলাম-ওদের কামরার জানালার সম্মুখে চারটি বাঙ্গালী যুবতী মেয়ে এলোমেলো চুলে করুণ ও অসহায় দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। জানালা দিয়ে তাদের দেহের যতটুকু দেখা গেল তাতে মনে হও তাদেরকে বিবস্ত্র করে রাখা হয়েছে। বুড়ীগঙ্গা নদীতে ১৫-২০ জন করে এক সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধা বাঙ্গালী যুবকদের বহু লাশ ভাসতে দেখলাম।



১৯৭১ সনের অক্টোবর মাসের এক দিন আমি বাড়িতে ছিলাম। সকাল নয়টার সময় আমি বাগড়া বাজারে গিয়েছিলাম বাজার করতে। বহু লোকের সমাগম ছিল। বাজারের দক্ষিণ দিকে পদ্মা নদী। পুর্বের দিন সন্ধ্যায় পাক সেনাদের নোঙ্গর করা ষ্টিমারটি পদ্মার ঘাট ছেড়ে যাচ্ছিল-ষ্টিমারের চারিদিকে সশস্ত্র পাক সেনারা প্রহরায় মোতায়েন ছিল। অকস্মাৎ দেখলাম পাক সেনারা ষ্টিমার থেকে সজোরে টেনে একটি লাশ ফেলে দিচ্ছে-ষ্টিমার দৃষ্টির বাইরে চলে যাওয়ার পর আমরা নৌকা নিয়ে গিয়ে দেখলাম এক ক্ষত বিক্ষত যুবতীর বীভৎস উলঙ্গ লাশ। এছাড়া কাশবনের পাড়ে পড়ে আছে ফোলা বীভৎস লালের গালে ও দেহের অন্যান্য স্থানে ক্ষত চিহ্ন দেখলাম। তাঁর ডান দিকের স্তনের বোটা তুলে নেওয়া হয়েছে।

স্বাক্ষর/- ইব্রাহিম ভূইয়া ৮/৬/৭৪



।। ৪ ।।

শ্রী পূর্ণ চন্দ্র বসাক, বি,এ

পিতা মৃত শ্রী বীর চন্দ্র বসাক

১৮, তাতীবাজার লেন, ঢাকা-১



আমি ১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ রাতে আমার ১৮, তাতীবাজারস্থিত বাসায় ছিলাম। রাত বারোটায় উত্তর দিক থেকে অকস্মাত কামানের আকাশ ফাটা গর্জন শুনে আমি তেতলার ছাদের উপর দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস সমূহে আগুনের ফুলকি ও লক্ষ লক্ষ আগুনের ফুলকিতে আকাশ ভরে আছে। অনবরত কামানের ভয়াল ও ভয়ংকর শব্দ আসছে। উত্তর দিকে আকাশে দেখলাম, একটা ঘোলাটে বেলুনের মত আগুনের পিন্ড পশ্চিম দিক থেকে আস্তে আস্তে উঠে পুর্ব দিকে গভর্নর হাউজের কাছে এসে নেমে পড়ল। এই সময় দেখলাম- চারিদিকে জনপদ, বস্তি এলাকায় আগুন আর আগুন জ্বলছে, বৃষ্টির মত গুলিবর্ষন হচ্ছে, কামানের কানফাটা গর্জন ভেসে আসছে। আমি ছাদে দাঁড়িয়ে দেখলাম গুলির আওয়াজ ক্রমে ক্রমে গুলিস্তান থেকে নওয়াবপুরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কিছুক্ষন পরই সদরঘাট খৃষ্টানদের গীর্জার সামনে সামরিক গাড়ী ও ট্যাংকের ঘর্ঘর আওয়াজ শুনলাম। এসময় শতকন্ঠের ‘মাগো বাবাগো বাঁচাও বাঁচাও’ আর্তনাদ শুনলাম। কিছুক্ষন পর সদরঘাট টার্মিনালে ভীষণ গুলিবর্ষনের আওয়াজ শুনলাম। শাখারীবাজার এর সকল হিন্দু জনতা যার যার ছাদে দাঁড়িয়ে এ বীভৎস কান্ড দেখছিল। রাত দুইটার সময় মাইকে ঘোষনা করা হল- রাজধানী ঢাকায় ২৬শে মার্চ ভোর পর্যন্ত কার্ফিউ জারি করা হয়েছে, যার যার বাড়িতে আওয়ামীলীগ ও স্বাধীন বাংলার পতাকা আছে তা নামিয়ে ফেলে পাকিস্তানের পতাকা তুলে দেয়ার নির্দেশ দেয়া যাচ্ছে। রাত দুইটার পর রাজধানীর পূর্বদিক থেকে আরেকটি জ্বলন্ত বেলুনের মত ঝলমলে গ্লোব পূব আকাশ থেকে উঠে আস্তে আস্তে সোজা পশ্চিমে ভেসে গিয়ে মিশে যেতে দেখলাম। ইহার পর আর একটি গুলির আওয়াজও কানে আসে নাই। চারিদিকে নীরব, নিস্তব্ধ, শ্মশ্মানের হাহাকার, আগুন আর আগুন জ্বলছে, রাজধানী ঢাকার চারিদিকে জনপদ ও বস্তি এলাকা জ্বলছে।



২৭শে মার্চ সান্ধ্য আইন তুলে নেয়ার পর শুনলাম, শাখারীবাজারে কোর্টে প্রবেশের পথে একটি বাড়ীতে দশজন হিন্দুকে একই ঘরে গুলিবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে এবং ডঃ শৈলেন সেনকে গ্রেফতার করে জগন্নাথ কলেজের পাক সেনাদের ছাউনিতে আটক করা হয়েছে। ইংলিশ রোড দিয়ে অগ্রসর হয়ে দেখলাম ইংলিশ রোড, ফ্রেঞ্চ রোডের দুই পাশের কোটি কোটি টাকার কাঠের কারখানা ও মেশিনপত্র ভস্ম হয়ে পাক সেনাদের বীভৎসতার স্বাক্ষর হয়ে পড়ে আছে- দুই পাশের বাণিজ্য এলাকার সকল দোকান ও বাণিজ্য কেন্দ্র নিশ্চিহ্ন হয়ে আছে। রাস্তাঘাট শূণ্য, কোথাও কোন মানুষ নাই। আমি কাজী আলাউদ্দিন রোড হয়ে বাবুপুড়া ফাড়িতে দেখলাম আটজন পুলিশী পোষাক পড়ে লাশ গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে ফাড়ির বারান্দায় ও রাস্তায় বিকৃতভাবে পড়ে আছে। রেললাইনের দুইপাশের বস্তি এলাকা ভস্ম ছাই হয়ে পড়ে আছে, দেখলাম চারিদিক জনমানবশূণ্য। আমি দ্রুত আমার বন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক জি কে নাথ, সংস্কৃতের অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথ ঘোষ ঠাকুর, অধ্যাপক শ্রী পরেশ চন্দ্র মন্ডলের খোঁজে জগন্নাথ হলে ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের দিক থেকে প্রবেশ করে দেখলাম জগন্নাথ হলের চারিদিকের দেয়াল গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে আছে। হলে জানালাসমূহের কাচ ভেঙ্গে খানখান হয়ে পড়ে আছে। হলের পুকুরের পাড় দিয়ে অগ্রসর হওয়ার সময় দেখলাম হঠাৎ একজন মানুষের মাথা উপরের দিকে উঠে আসার চেষ্টা করছে, ভীতসন্ত্রস্ত, দিশেহারা, উন্মাদের মত হয়ে পানি থেকে মাথা তুলে ক্রন্দন ও বুকে চপেটাঘাত করতে করতে বলতে লাগলেন ‘দাদা ওদিকে যাবেন না, ওরা আমাদের সব মেরে ফেলছে।‘ আমি লোকটিকে উন্মাদ মনে করে তার কথায় কান দেই নাই। আমি আরও অগ্রসর হয়ে কেন্টিনের দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম একটা প্রাণীও নাই, নীরব, জনমানবশূণ্য। কেন্টিনের ভেতর দিয়ে হলের নর্থ হাইজে প্রবেশ করে দেখলাম- একজন হিন্দু যুবকের লাশ পড়ে আছে- মাথার চুল আগুনে পোড়া, সারা দেহ গুলিতে ঝাঁঝরা, আমি দোতলায় না উঠে সোজা রাস্তায় নেমে শহীদ মিনারের সামনে এসে দেখলাম- শহীদ মিনারটি ভেঙ্গে খানখান হয়ে পড়ে আছে। শহীদ মিনারের পেছনে সদ্য মাটি তোলা ১০০ ফুট এক বিরাট গর্ত দেখলাম- গর্তটি কিছুক্ষন পূর্বেই মাটি দিয়ে ভরাট করে রাখা হয়েছে। গর্তের উপরে মাটি ভেদ করে কারো হাত, পায়ের পাতা দেখা যাচ্ছে। আমি আরো উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে হলের শেষ মাথায় লোহার গেইটে পৌছলে পেছন থেকে এক দিশেহারা কর্কশ নারীকণ্ঠ চিৎকার করে বললেন- ‘আপ কাহা যাতে?’ আমি সেই কন্ঠের দিকে নজর না দিয়ে শামসুন্নাহার হলের দিকে অগ্রসর হয়ে জগন্নাথ হলের হাউস টিউটর মিঃ জি কে নাথ, রবীন্দ্রনাথ ঘোষ ঠাকুর, পরেশ মন্ডলের কোয়ার্টারের প্রবেশপথে গিয়ে দেখলাম- কোয়ার্টারের দরজা জানালা সব খোলা, জনমানবশূণ্য, সিড়ি বেয়ে উপড়ে উঠতে গিয়ে দেখলাম- দোতলা থেকে পচা দুর্গন্ধ ভেসে আসছে, সিড়ির উপর থেকে নিচ পর্যন্ত রক্তের দাগ জমাট বেধে আছে। আমি এ পচা, দূর্গন্ধ ও জমাট রক্ত দেখে আর উপরে উঠরে পারি নাই। বন্ধুদের খোঁজ করতে গিয়ে আমি এখানেই প্রথম ভয় পেলাম এবং ভড়কে গেলাম। আমার মাথা ঘুরতে লাগল সেই বীভৎস দৃশ্য দেখে। আমি নিচে নেমে আসলাম এবং ভীত সন্ত্রস্তভাবে যেই পথ দিয়ে এসেছিলাম, সেই পথে দ্রুত ফিরে গেলাম। ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তা ধরে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভেতর প্রবেশ করলাম। প্রবেশ পথে জগন্নাথ হলের একজন চাপরাশীর সাক্ষাৎ পেলাম। সে বললো, আমাদের হলের প্রভোস্ট ডঃ জোতির্ময় গুহ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালের দোতলায় ৯ নম্বর কক্ষে আছেন, তিনি জীবিত আছেন। আপনি তার সাথে সাক্ষাৎ করুন। আমি হাসপাতালের ৯ নং কামরায় প্রবেশ করতেই হাতে ব্যান্ডেজ বাধা আহত হলের একজন যুবক এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে ক্রন্দন করতে করতে বলতে থাকলেন ‘দাদা আমি কি বেঁচে আছি? দেখেন আমাকে ওরা গুলি করেছে। ঐ যে দেখুন জোতির্ময় বাবু- তাঁকেও পশুরা গুলি করেছে।‘ আমি তাকে উন্মাদের মত মনে করলাম, তার অসংলগ্ন কথায় বুঝতে পারলাম সে প্রকৃতস্থ নয়। আমি আরো অগ্রসর হয়ে দেখতে পেলাম জোতির্ময় বাবু শুয়ে আছেন জ্ঞানহারা, মাঝে মাঝে দীর্ঘ চাপা নিঃশ্বাস ফেলছেন, মাঝে মাঝে চোখ খুলে আবার বন্ধ করে ফেলছেন। আমি অনেক্ষণ তার পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর করুণ অবস্থা দেখলাম। তিনি একবার আমার দিকে চেয়ে বললেন ‘কে?’ আমি বললাম ‘আমি বসাক, আমি পূর্ণ বাবু।‘ তিনি উত্তরে বললেন ‘ও‘। একটু পরেই বিড়বিড় করে বললেন, ‘ডাঃ গোবিন্দবাবু, ডাঃ গোবিন্দবাবু ইজ প্রসিডিং ওয়েল।‘ একথা বলেই তিনি জ্ঞানহারা হয়ে গেলেন, সঙ্গা হারিয়ে ফেললেন। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার এই অন্তিম দৃশ্য দেখছিলাম। একটু পরেই বারান্দা থেকে তার স্ত্রী বাসন্তী দেবী ক্রন্দনরতা অবস্থায় কাতরকন্ঠে বললেন, ‘দাদা আপনি এসেছেন? আমাকে একটু সাহায্য করুন। কাল থেকে এই হাসপাতালে কিছুই নাই। আমাকে একটি এক্সরে প্লেট যোগাড় করে দিন?’ আমি উত্তরে বললাম ‘দাস কোম্পানীর দোকান খোলা পেলে এখনি এনে দিচ্ছি’- বলে তাকে প্রবোধ দিলাম। আমি তাকে ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি সমস্ত ঘটনা বললেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম গুলি কোথায় লেগেছে? উত্তরে বললেন, ঘাড়ে একটি গুলি বিদ্ধ হয়ে ঘাড় ভেদ হয়ে বেড়িয়ে গেছে। পেটে নাভির কাছে ব্যথার যন্ত্রনার কথা বলছেন। বোধহয় পেটের ভেতরেও গুলি লেগেছে। আমি তাকে স্বান্তনা দিয়ে চলে আসলাম। প্রবেশ পথে আসলে হলের সেই আহত গুলিবিদ্ধ ছাত্রটিকে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কিভাবে বাঁচলে? সে বলতে লাগল, খান সেনারা ভারী অস্ত্র নিয়ে রাত বারোটার দিকে আমাদের হলের গেট ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে প্রত্যেক কামরায় ব্যাপক তল্লাশী চালায়- হল বন্ধ থাকলেও কতিপত অনার্স পরীক্ষার্থী ও এম, এ পরীক্ষার্থী ২০-২৫ জন হলে অবস্থান করছিল। প্রত্যেক কক্ষে প্রবেশ করে যাকে যেখানে পেয়েছে সেখানেই গুলিবিদ্ধ করে হত্যা করেছে, আমি সে সময় হলের বাথরুমে পালিয়েছিলাম। তারা আমাকে বাথরুমেই ধরে ফেলে। আমাকে ধরে ওরা বলল, ‘তোমকো কুচ নেহি বলেগা’ এবং দোতলা থেকে আরো তিনজন ছাত্রওকে নামিয়ে এনে বলল, ‘ইয়ে দেখ তোমলোগ কো কুচ নাহি করেগা। উপর যতনা লাশ হ্যায়, সব নিচে লে আও।‘ আমরা চারজন তাদের নির্দেশমত উপর থেকে সদ্য গুলিবিদ্ধ শহীদদের লাশ নিচে নিয়ে আসলাম। বীর শহীদদের সব লাশ আমরা শহীদ মিনারের গর্তের সামনে নিয়ে এসে দেখলাম- পাক সেনারা সশস্ত্র ভাবে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। লাশগুলো ওরা গর্তের ভেতর ফেলে মাটিচাপা দিল। হত্যাযজ্ঞ শেষে আরেকদল সৈন্য আবার উপরে গিয়ে তল্লাশি চালিয়ে ফিরে আসল- আমাদের ৪ জনকে লাইন ধরে দাড়াবার নির্দেশ দিল- আমরা দাঁড়িয়ে গেলাম লাইন ধরে, এরপর আমাদের উপর গুলিবর্ষন করতে থাকল। আমাদের উপর গুলিবর্ষণ হওয়া মাত্র আমি মৃতের ভান করে পড়ে গেলাম। বীর শহীদদের সেই লাশের মাঝেই পড়ে থেকে দেখলাম- পাক সৈন্যরা আর্মি ট্রাক নিয়ে সদলবলে চলে গেল। চারদিক চেয়ে যখন নিশ্চিত হলাম তারা আর নেই- তখন সেই লাশের মধ্যে থেকে উঠে এক দৌড়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলে এসেছি।



আমি বাড়িতে এসে দেখলাম শাখারীবাজারে থমথমে ভাব- শাখারীবাজারের হিন্দু অধিবাসীগন মনে করেছিল আর কোন হত্যাকান্ড হবে না। পাকপশুরা সাধারন নাগরিকদের উপর আর পাইকারী ভাবে হত্যাকান্ড ঘটাবে না। আমরা আমাদের এলাকায় ২৭ ও ২৮ শে মার্চ দিনের বেলায় কোন পাকসেনা দেখি নাই। কিন্তু কার্ফু আরম্ভ হওয়ার সাথে সাথে পাকসেনারা ঘরেঘরে প্রবেশ করে হত্যাকান্ড চালায় এবং বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে। আমরা কয়েকদিন ছাদের উপর বসে থেকে ঢাকার চারিদিকে শুধু গুলিবর্ষনের শব্দ শুনেছি। ১৯৭১ সনের ২৮শে মার্চ গুজব ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিহারী জনতা হিন্দু মহল্লা হামলা করার জন্যে এগিয়ে আসছে। এ খবর পাওয়া মাত্রই আমরা তাতীবাজার থেকে সকল হিন্দু পরিবার দলে দলে একযোগে বুড়িগংগা নদী পার হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে পল্লী এলাকায় চলে যাই। আমরা কেই কারো সাথে কোন জিনিসপত্র নিয়ে যেতে পারি নাই- সবাই শূণ্যহাতে রুদ্ধশ্বাসে পালিয়েছি। কিশোর, শিশু, যুবক-যুবতী, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-যুবা সবাই শূণ্য হাতে পালিয়েছি। নদীর ওপার থেকে আমরা সংবাদ পেয়েছি যে ঢাকার জিন্দাবাজার মালিটোলা, বাবুবাজার এলাকায় ব্যাপক লুটতরাজ আরম্ভ হয়েছে। মুল্যবান জিনিসপত্র, সোনাদানা, তামা-কাসা, পিতল, কাপড়-চোপড়, খাট, চকি, দরজা-জানালা সব কিছু তারা লুট করে নিয়ে গেছে। লুট হওয়ার পরক্ষনেই সশস্ত্র বিহারীরা একযোগে এসে শাখারীবাজার, তাতীবাজার, সুতারনগর, গোপালনগরে সকল হিন্দুবাড়ি দখল করে বসেছে। আমরা নয় মাস নদীর অপর পাড়ে বাধৈর গ্রামে নিদারুন দুরবস্থায় অর্ধাহারে-অনাহারে কাটিয়েছি।



স্বাক্ষর

শ্রী পূর্ণচন্দ্র বসাক

২৯শে বৈশাখ, ১৩৭৮



।। ৫ ।।

আবদুল কুদ্দুস মিয়া

রিজার্ভ ইন্সপেক্টর অব পুলিশ

বি,আর পি, হেড কোয়ার্টার, রাজারবাগ, ঢাকা



১৯৭১ সনের ১৫ই মে থেকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশের জমায়েত করা হয়। পাঞ্জাবী পুলিশ লাইনে এসেই যথেচ্ছা ব্যবহার আরম্ভ করে দেয়; কথায় কথায় পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশরা আমাদের বুটের লাথি ও বন্দুকের বাট দিয়ে পিটাতে থাকে, চোখ রাঙ্গিয়ে বলতে থাকে ‘শুয়ারকা বাচ্চা, হিন্দুকা লাড়কা, বেইমান শালা লোগ, হামলোগ আদমী নাহি মাংতা, জামিন মাংতা’’।



আমাদেরকে হেডকোয়ার্টারের সকল কক্ষ থেকে কুকুর বিড়ালের মতো তাড়িয়ে দিয়ে সেখানে পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশদের জায়গা দেয়া হয়, আমাদের পোষাক পরিচ্ছদ, কাপড় আসবাবপত্র সব বাইরে ফেলে দেয়া হয়, আমারা অসহায়ের মত আমাদের আসবাব পত্র তুলে নিয়ে আসতাবলের সামনে, ব্যারাকের বারান্দায় আশ্রয় গ্রহন করি। পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ রাজারবাগ আসার পরেই বাঙ্গালীদের উপর নির্মম অত্যাচার নেমে আসে। প্রতিদিন, “ইয়ে শালা লোগ মুক্তি হায়” বলে বহু নিরীহ বাঙ্গালী যুবককে চোখ বেঁধে মিলিটারী ট্রাক ও জীপ থেকে আমাদের চোখের সামনে নামিয়ে হেডকোয়ার্টার বিল্ডিংয়ের উপর তলায় নিয়ে রাখা হয়। সারাদিন এভাবে চোখ বেঁধে বাঙ্গালী যুবকদের রাজারবাগ এনে জমায়েত করা হয় এবং সন্ধ্যার পর এ সব অসংখ্য বাঙ্গালী যুবককে মিলিটারী ট্রাকে করে ঢাকা সেনা নিবাসে নিয়ে হত্যা করা হয়। হেডকোয়ার্টারের তেতলা ও চারতলায় বহু যুবতী উলঙ্গ করে রাখা হয়-পাঞ্জাবী সেনা ও পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ এসব ধরে আনা বালিকা ও মহিলাদের উপর অবিরাম ধর্ষণ চালায়। লাইনে পুলিশের কলরবের জন্য আমারা অত্যাচারিত মেয়েদের ক্রন্দন রোল শুনতে পেতাম না- লাইনে দূরে গিয়ে দাঁড়ালেই ধর্ষিতা মেয়েদের আর্তনাদ ও আহজারি শুনতে পেতাম-রাতে ধর্ষিতা মেয়েদের বুকফাটা চিৎকারে আমরা কোয়ার্টারে ঘুমাতে পারতামনা- সারারাত পরিবার পরিজন নিয়ে জেগে থাকতাম। হেড কোয়ার্টার বিল্ডিং থেকে ভেসে আসা ধর্ষিতা মেয়েদের আর্তনাদে আমরা বাঙ্গালী মেয়েদের দুর্দশা দেখে দুঃখে, ক্ষোভে, বেদনায় দিশাহারা হয়ে পড়েছিলাম। আমরা ঐ সকল অসহায় মেয়েদের উদ্ধার করার জন্য কিছুই করি নাই, করতে পারি নাই, কারণ ওদেরকে উদ্ধার করার জন্য, ওদের অত্যাচারের সহানুভুতি ও দরদ দেখানোর কোন সুযোগ আমাদের ছিল না।



হেডকোয়ার্টারের তেতলা ও চারতলায় যেখানে বাঙ্গালী মেয়েদের উলঙ্গ অবস্থায় ঝুলিয়ে রেখে ধর্ষণ করা হতো সেখানে সব সময় পাঞ্জাবী সৈন্যরা প্রহরায় মোতায়েন থাকতো। সেখানে আমাদের প্রবেশ করার অনুমতি ছিল না। মিঃ বোস্তান খাঁ নামে এক পাঞ্জাবী ভদ্রলোক এ সময় রাজারবাগ পুলিশ লাইনের রিজার্ভ ইন্সপেক্টর ছিলেন। এই ভদ্রলোক আমাদের লাইনের দায়িত্বভার গ্রহন করার পর আমাদের উপর সবদিকথেকে অত্যাচার ও দমন নীতি আরম্ভ হয়ে যায়। পুলিশ লাইনে কখন আমাদের উপর মৃত্যুর করাল গ্রাস নেমে আসে, আমরা এই ভয়ে সব সময় সন্ত্রস্ত থাকতাম।



১৯৭১ সনের ৪ঠা এপ্রিল রাজারবাগ পুলিশ লাইন থেকে তৎকালীন ষ্টোর-ইন-চার্জ পুলিশ সার্জেন্ট মিঃ মুর্তজা হোসেন এবং সুবেদার আবুল হোসেন খান এবং সুবেদার মোস্তফাকে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পাঞ্জাবী সেনারা এই তিনজন বাঙ্গালী পুলিশকে ওদের ক্যাম্পে নিয়ে নির্মম অত্যাচার চালায়-পঞ্জাবী সেনারা এই তিনজন বাঙ্গালী পুলিশকে ওদের ক্যাম্পে নিয়ে নির্মম অত্যাচার চালায়-পাঞ্জাবী সেনারা লাইন হয়ে ওদেরকে ঘেরাও করে দাড়িয়ে ফুটবলের মত বুট দিয়ে লাথি মেরে খেলতে থাকে। ওদের তিন জনের দেহ লাঠি, বেত, বুট ও বেয়নেট দিয়ে গরুর মত পিটিয়ে চুরমার করে দেওয়া হয়, সারা দেহ চাক চাক করে কেটে দেওয়া হয়। ওদের দেহ রক্তাক্ত হয়ে একেবারে অবশ ও অচল হয়ে গেলে তাদের তিনজনকে গুলি করে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওদের ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখে যাকে তাদের হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, সেই পাঠান তাদেরকে ছেড়ে দেন। পদস্থ পাঞ্জাবী মিলিটারী অফিসারদের তাদের হত্যা করার জন্য তিনটি ফাকা গুলির শব্দ শুনিয়ে দেয় এবং দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আত্মগোপন করে থাকার জন্য বলা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমি উপরোক্ত তিন সহকর্মীর নিকট উক্ত ঘটনা বিস্তারিত জানতে পেরেছি।



১৯৭১ সনের ডিসেম্বরে ঢাকা রাজধানীতে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সম্মিলিত অবিজানের মুখে আমরা রাজারবাগ পুলিশ লাইনের পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ ও পাঞ্জাবী সেনাদের বেসামাল অবস্থায় দেখতে পাই। বাংলাদেশ মুক্ত হলে মিত্রবাহিনী ও মুক্তি বাহিনী রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সকল পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ ও পাঞ্জাবী সেনাদের বন্দী করে নিয়ে যায়।



স্বাক্ষর/-

আবদুল কুদ্দুস

২৬-৩-৭৪

রিজার্ভ ইন্সপেক্টর অফ পুলিশ,

বি,আর,পি,

রাজারবাগ, ঢাকা।















।। ৬ ।।

সুবেদার খলিলুর রহমান

আর্মস এস আই, বি, আর পি,

রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা।



১৯৭১ সনের ২৯শে মার্চ সকাল দশটায় আমরা মিল ব্যারাক পুলিশ লাইনে উপস্থিত হয়ে আমাদের প্রিয় পুলিশ সুপার মিঃ ই, এ, চৌধুরী, পুলিশ কমান্ডেন্ট মিঃ হাবিবুর রহমান, ডি, এস, পি লোদী সাহেব, রেঞ্জ রিজার্ভ ইন্সপেক্টর মিঃ মতিউর রহমান সবাইকে উপস্থিত দেখলাম। মিঃ ই, এ, চৌধুরী সাহেব ক্ষুধার্ত, আহত, ক্ষতবিক্ষত সিপাহীদের দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। লাইনে মুহূর্তে কান্নার রোল পড়ে গেল। তিনি লাইনের মধ্যে প্রবেশ করে প্রতিটি সিপাহীর আহত, ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখলেন, তার দু’চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু পড়ছিল। তিনি অবিলম্বে আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। তিনি বললেন, তোমাদের কোন অসুবিধা নাই, তোমরা নীরবে তোমাদের কাজ করে যাও।” আমি তোমাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখবো।



আমার সাথে আরও তিনজন সুবেদার, সুবেদার সফিকুর রহমানের সহকর্মীর সাথে আটজন হাবিলদার- মোঃ ফজলুল হক, আঃ ওয়াদুদ, আবদুল কুদ্দুস ও অন্যান্য বিশজন পুলিশ কনস্টেবল দিয়ে ঢাকা কোতোয়ালী থানার দায়িত্ব দেয়া হয়। আমরা থানায় প্রবেশ করে দেওয়ালে, মেঝেতে চাপ চাপ রক্ত দেখতে পেলাম, দেখলাম থানার দেওয়াল গুলির আঘাতে ঝাঁজরা হয় আছে, বুড়ীঙ্গার পাড়ে অসংখ্য মানুষের মৃতদেহ পেলাম, আমাদের পি, এর, এফ, এর কনস্টেবল আবু তাহেরের ( নং ৭৯৮) পোশাকপরা লাশ ভাসছে, আরও বহু সিপাহীর ক্ষত বিক্ষত লাশ দেখতে পেলাম। আমার চোখ বেয়ে অশ্রু পড়ছিল, আমি দিশাহারা হয়ে কাঁদতে কাঁদতে আমার প্রিয় সিপাহী তাহেরের লাশ ধরতে গেলে পিছন থেকে এক পাঞ্জাবী সেনা গর্জ্জন করে কর্কশ ভাবে বলতে থাকে “শূওর কা বাচ্চা, তোমকো ভি পাকড়াতা হায়, কুত্তাকা বাচ্চা, তোম কো ভি সাত মে ‘গুলি করেগা” আমি আর্ম সাব ইন্সপেক্টর হওয়া সত্ত্বেও একজন সাধারণ পাক সেনা আমার সাথে কুকুরের মত ব্যবহার করলো। দুঃখে, অপমানে, লজ্জায়, আমি যেন অবশ হয়ে পড়লাম। প্রতিবাদ করতে চাইলাম সর্বশক্তি দিয়ে কিন্তু পারলাম না। প্রতিবাদ করার কোন উপায় ছিল না। তাই ওদের অসহ্য আপত্তিকর কার্যকলাপের প্রতিবাদ করি নাই, সবকিছু নীরবের সহ্য করেছি ওদের যথেচ্ছ কার্যকলাপের নীরব সাক্ষী হয়ে রয়েছি।



কোতোয়ালী থানার বরাবর সোজাসুজি গিয়ে বুড়ীগঙ্গার লঞ্চঘাটের পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম বুড়ীগঙ্গার পাড়ে লাশ, বিকৃত, ক্ষত-বিক্ষত, অসংখ্য মানুষের লাশ ভাসছে পুলিসের পোশাক পড়া বীভৎস লাশ। দেখলাম বিভিন্ন বয়সের নারী পুরুষ, বৃদ্ধা-যুবা, যুবক-যুবতী, বালক-বালিকা, কিশোর-শিশুর অসংখ্য লাশ। যতদূর আমার দৃষ্টি যায় দেখলাম বাদামতীল ঘাট থেকে শ্যামবাজার ঘাট পর্যন্ত নদীর পাড়ে অসংখ্য মানুষের বীভৎস পচা ও বিকৃত লাশ, অনেক যুবতীর লাশ দেখলাম, এই পূত-পবিত্র বীরাঙ্গনাদের ক্ষত-বিক্ষত যোনিপথ দেখে মনে হলো, পাঞ্জাবী সেনারা কুকুরের মত ওদের পবিত্র দেহের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওদেরকে যথেচ্ছভাবে ধর্ষণ করে গুলিতে ঝাঁজরা করে নদীতে ফেলে দিয়েছে। অনেক শিশুর ও বালক-বালিকাদের থেতলে যাওয়া লাশ দেখলাম। ওদেরকে পা ধরে মাটিতে আছড়িয়ে মারা হয়েছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অশ্রুভরা চোখে আমি লাশ দেখলাম- লাশ আর লাশ-অসংখ্য নিরীহ বাঙ্গালীর লাশ- প্রতিটি লাশে বেয়নেট ও বেটনের আঘাত দেখলাম, দেখলাম কারও কারও মাথা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে আছে, পাকস্থলি সমেত হৃৎপিণ্ড বের করা হয়েছে, পায়ের গিট হাতের কব্জা ভাঙ্গা, ঝুলছে পানিতে। সদরঘাট টার্মিনালের শেডের মধ্যে প্রবেশ করে শুধু রক্ত আর রক্ত দেখলাম- দেখলাম মানুষের তাজা রক্ত এই বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে। এই টার্মিনাল শেড ছিল ২৫শে মার্চের কালো রাত্রিতে ওদের জল্লাদখানা। ওরা বহু মানুষকে ধরে এনে ঐ টার্মিনালে জবাই করে বেটন ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে টেনে হিঁচড়ে পানিতে ফেলে দিয়েছে। অসংখ্য মানুষকে এভাবে নদীতে ফেলে দেওয়ার পরিষ্কার ছাপ দেখতে পেলাম সেই রক্তের স্রোতের মধ্যে। শেডের বাইরের প্রাঙ্গণে দেখলাম অসংখ্য কাক ও শকুন মানুষের সেই রক্তের লোভে ভীর করেছে। সদরঘাট টার্মিনাল থেকে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বের হয়ে পূর্বদিকে পাক সেনাদের সদর আউট পোস্টের দিকে দেখলাম নদীর পাড়ের সমস্ত বাড়িঘর ভস্ম হয়ে ওদের নৃশংসতা ও বীভৎসতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখালাম রাস্তার পার্শ্বে মিউনিসিপালিটির কয়েকটি ময়লা পরিষ্কার করার ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে, সুইপাররা হাত পা টেনে হেঁচড়ে ট্রাকে লাশ উঠাচ্ছে, প্রতিটি ঘর থেকে আমাদের চোখের সামনে বহু নারী-পুরুষ, বালক-বালিকা, কিশোর-শিশু ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধার লাশ সুইপাররা টেনে ট্রাকে উঠাচ্ছিল। পাঞ্জাবী সেনারা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে কুকুরের মত নির্মমভাবে প্রহরা দিচ্ছিল। ভয়ে সন্ত্রাসে আমি আর এগুতে পারলাম না। পুর্বদিকে রাস্তা দিয়ে আমি সদরঘাটের কাপড়ের বাজারের নীরব নিথর রাস্তা ধরে সদরঘাট বেপটিস্ট মিশনের চৌরাস্তার সম্মুখে দিয়ে নওয়াবপুরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলাম। আমাদের কারো শরীরে পুলিশের পোশাক ছিল না- আমি এবং আমার সাথে আরও দু’জন সিপাহী সাধারণ পোশাক পড়ে দায়িত্ব পালন করছিলাম।



কাপড়ের বাজারের চারদিকে রূপমহল সিনেমা হলের সম্মুখে সর্বত্র বিভিন্ন বয়সের অসংখ্য মানুষের ইতস্ততঃ ছড়ানো বীভৎস লাশ দেখলাম, বহু যুবতী মেয়ের ক্ষত-বিক্ষত লাশ দেখলাম।



খৃষ্টান মিশনারী অফিসের সম্মুখে, সদরঘাট বাস স্টপেজের চারদিকে, কলেজিয়েট হাইস্কুল জগন্নাথ কলেজ, পগোজ হাইস্কুল, ঢাকা জজকোর্ট, পুরাতন স্টেট ব্যাংক বিল্ডিং, সদরঘাট গির্জা, নওয়াবপুর রোডের সর্বত্র, ক্যাথলিক মিশনের বাইরে এবং ভিতরে আদালত প্রাঙ্গণে বহু মানুষের মৃতদেহ দেখলাম। রাস্তায় রাস্তায় দেখলাম পুলিশের পোশাক পড়া বহু মৃতদেহ, রায় সাহেব বাজার ব্রিজ পার হয়ে নওয়াবপুর রোডে পা দিয়েই দেখলাম বিহারীদের উল্লাস ও উন্মত্ত লাফালাফি, ওরা পশুর মত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে অসংখ্য বাঙ্গালীর লাশ পাড়িয়ে জয়ধ্বনি করে মিছিল করে নওয়াবপুরের রাস্তায় বের হয়ে পড়ছিল। পাঞ্জাবী সেনা কর্তৃক নির্বিচারে বাঙ্গালী হত্যার খুশীতে দেখলাম বিহারীরা রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা নিরীহ বাঙ্গালীদের লাশের উপর লাথি মারছে, কেউ প্রস্রাব করে দিচ্ছে, হাসতে হাসতে, রাস্তায় রাস্তায় বিহারী এলাকায় দেখলাম সরু বাঁশের মাথায় বাঙ্গালী বালক ও শিশুর লাশ বিদ্ধ করে খাড়া করে রাখা হয়েছে। দেখলাম উন্মত্ত বিহারী জনতা রাস্তায় পড়ে থাকা লাশ গুলিকে দা দিয়ে কুপিয়ে কুচি কুচি করে কেটে আনন্দ করছে, উশৃঙ্খল বিহারী ছেলেরা রাস্তায় বেড়িয়ে পড়ে উল্লাস করছে, রাস্তার দুই পার্শ্বে সর্বত্র আগুন আর আগুন দেখলাম। বিহারী জনতা রাস্তার পার্শ্বের প্রতিটি বাড়িতে প্রবেশ করে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল, জ্বলছিল বাঙ্গালীদের ঘর-বাড়ী ,আসবাবপত্র পণ্যদ্রব্য, পোশাক পরিচ্ছদ মুল্যবান জিনিসপত্র। ঠাটারী বাজারের ট্রাফিক ক্রসিংয়ে এসে দেখলাম একটি যুবক ছেলের বীভৎস লাশের উপর পেট চিড়ে বাঁশের লাঠি খাড়া করে লাঠির মাথায় স্বাধীন বাংলার একটি মলিন পতাকা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। লাশের উপর জয় বাংলার পতাকা ঝুলিয়ে রেখে বিহারী জনতা চারদিকে দাঁড়িয়ে থেকে হাসছে, উল্লাস করছে। দেখলাম লাশের গুহ্যদ্বার দিয়ে লাঠি ঢুকিয়ে আনন্দ প্রকাশ করছে। বিজয় নগরের রাস্তা ধরে আমি শান্তিবাগে আমার কোয়ার্টারের আসছিলাম- দেখলাম তখনও রাস্তার চারিপার্শ্বের ঘরবাড়ি জ্বলছে।



আমি কোতোয়ালী থানার দায়িত্ব পালন করতাম, ৩০ শে মার্চ কোতোয়ালী থানার মধ্যে আমরা কামরায় কামরায় প্রবেশ করে দেওয়ালের সর্বত্র চাপ চাপ রক্ত দেখলাম, দেখলাম থানার পায়খানা, প্রশ্রাবখানা ও অন্যান্য দেওয়াল গুলির আঘাতে ঝাঁজরা হয়ে গেছে।



১৯৭১ সনের মার্চ মাসের পর কোতোয়ালী থানার কোন বাঙ্গালী পুলিশকে বাহিরে টহলে পাঠানো হতো না, থানায় বসিয়ে রাখা হত। এক পাঞ্জাবী মেজর আমাদেরকে তদারক করে যেতেন মাঝে মাঝে এসে।



৫ই এপ্রিল আমাদের সবাইকে কোতোয়ালী থানা থেকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আনা হয়। পুলিশ লাইনে এসে আমাদের ব্যারাক কেন্টিন, আসবাবপত্র, পোশাক পরিচ্ছদ সবকিছুর ভস্ম ছাই দেখলাম। তিন নম্বর ব্যারাকে প্রবেশ করে আমার দু’জন প্রিয় সিপাহীর অগ্নিদগ্ধ লাশ দেখলাম-লাশের পায়ে শুধুমাত্র বুট ছিল, তাদের পোশাক পরিচ্ছদ সারা দেহ জ্বলে শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমার প্রিয় সিপাহী জাহাঙ্গীর ও আবদুস সালামের বীভৎস লাশ দেখে আমি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। লাশের দিকে মাথা নত করে আমার দু’জন বীর সিপাহীকে সালাম জানালাম, অশ্রুসিক্ত নয়নে। পুলিশ লাইনের উত্তর পূর্বদিকের পুকুরের উত্তর পাড়ে শহীদ সিপাহীদের যথার্থ মর্যাদার সাথে সমাহিত করলাম।



পুলিশ লাইন থেকে পাঞ্জাবীরা চলে গেলেও রাজারবাগ পুলিশ লাইনে চরম ভয় ভীতি, সন্ত্রাস ও হতাশা বিরাজ করছিল। আমরা সব সময় মৃত্যু ভয়ে ভীত ও আতঙ্কগ্রস্ত থাকতাম। ঢাকা ডিস্ট্রিক্ট বিশেষ পুলিশ ফোর্সের রিজার্ভ ইন্সপেক্টর ছিলেন এ সময় বোস্তান খাঁ নামে এক চরম বাঙ্গালী বিদ্বেষী পাঠান ভদ্রলোক। এ ভদ্রলোক পুলিশ লাইনের দায়িত্বভার গ্রহন করেই চরম সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। তিনি ৬ই এপ্রিল লাইনে বসেই বাঙ্গালী পুলিশের সাথে কুকুরের মত যথেচ্ছ ব্যবহার আরম্ভ করে দেন। লাইনে প্রবেশ করে স্বাস্থ্যবান, শক্তি সমর্থ কনস্টেবলদের ধরে, হাড়ের গিরায় গিরায় বেদম ভাবে পিটুনি দেন। খুঁজে খুঁজে তার পছন্দ ও ইচ্ছামত যাকে ইচ্ছা তাকেই ধরে মুক্তিবাহিনী বলে ঢাকা সেনানিবাসে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন তারা আর কোনদিন ফিরে আসেনাই। সাথে সাথে ঢাকা সেনানিবাস থেকে মিলিটারী ট্রাকে করে পাঞ্জাবী সেনারা হঠাৎ পুলিশ লাইনে উপস্থিত হয়ে বাঙ্গালী পুলিশদের তদারক আরম্ভ করে দিত। পাইকারীভাবে নাম ও নাম্বার জিজ্ঞাসা করতে করতে অকস্মাৎ অনেককে “তোম শালা মুক্তি বাহিনী হায়, চলো” বলে গরুর মত বুটের লাথি মারতে মারতে ট্রাকে উঠিয়ে নিয়ে যেত। আমি তখন পি, আর, এফ-এর ফোর্স সুবেদার ছিলাম। মিলিটারী ট্রাক লাইনে প্রবেশ করার সাথে সাথে আমি যে কোন অজুহাতে লাইনের বাইরে চলে যেতাম। পাঞ্জাবী সেনারা লাইনে প্রবেশ করলে লাইনের সর্বত্র যেন সবার মুখে মৃত্যুর কালো ছায়া নেমে আসতো। বাঙ্গালী পুলিশ যার যার মত ব্যারাকে প্রবেশ করে ওদের দৃষ্টির আড়ালে থাকার চেষ্টা করত। কারণ ওদের দৃষ্টিতে পড়ে গেলেই ওরা যে কোন অজুহাতে বাঙ্গালী পুলিশদের বিপন্ন করতো, বিপদগ্রস্ত করে তুলতো।



১৯৭১ সনের মে মাসে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পশ্চিম পাকিস্তানী পাঞ্জাবী পুলিশ এসে গেলে রিজ্জার্ভ ইন্সপেক্টর কুকুরের মত অট্টহাসীতে ফেটে পড়ে বলতে থাকে “যাও শালা লোক শোয়ার কা বাচ্চা হামারা ব্যারাক ছোড়ো, হামারা আদমী আগিয়া, শালা লোগ, ভাগো”। একথা বলার সাথে সাথে বিহারী, পাঞ্জাবী, পাঠান পুলিশ ও পশ্চিম পাকিস্তানী পোশাক পরিচ্ছদ, আসবাবপত্র সবকিছু ব্যারাকের বাইরে ফেলে দিয়ে আমাদের ঘাড়ে ধরে বের করে দেয়। আমরা বাঙ্গালী পুলিশরা অসহায় এতিমের মত আমাদের পোশাক পরিচ্ছদ কুড়িয়ে নিয়ে লাইনের আস্তাবলে বারান্দায় গাছের নিচে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে আশ্রয় গ্রহণ করি। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে যোগদান করার পর আমরা দেখেছি পাঞ্জাবী সেনারা মিলিটারী ট্রাকে ও জীপে করে প্রতিদিন স্কুলে, কলেজে, ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের, ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বালিকা, যুবতী মেয়ে ও সুন্দরী রমণীদের ধরে আনতে থাকে। অধিকাংশ বালিকা, যুবতী মেয়ের হাতে বই ও খাতা দেখেছি। প্রতিটি মেয়ের মুখমণ্ডল বিষণ্ণ, বিমর্ষ ও বিষময় দেখেছি। মিলিটারী জীপে ও ট্রাকে যখন এভাবে যুবতী মেয়েদের রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আনা হতো তখন পুলিশ লাইনে হৈচৈ পড়ে যেত, পাঞ্জাবী বিহারী ও পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ জিভ চাটতে চাটতে ট্রাকের সম্মুখে এসে মেয়েদের টেনে হেচড়িয়ে নামিয়ে দিয়ে তৎক্ষণাৎ দেহের পোশাক পরিচ্ছদ কাপড় চোপড় খুলে তাদেরকে সম্পূর্ণ ভাবে উলঙ্গ করে আমাদের চোখের সামনেই মাটিতে ফেলে কুকুরের মত ধর্ষণ করত। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ও অঞ্চল থেকে ধরে এ সকল যুবতী মেয়েদের সারাদিন নির্বিচারে ধর্ষণ করার পর বৈকালে আমাদের পুলিশ হেডকোয়ার্টার বিল্ডিং এর উপর তাদেরকে উলঙ্গ করে চুলের সাথে লম্বা রডের সাথে বেঁধে রাখা হতো। রাতের বেলায় এসব নিরীহ বাঙ্গালী নারীদের উপর অবিরাম ধর্ষণ চালানো হতো। আমরা গভীর রাতে আমাদের কোয়ার্টারে বসে মেয়েদের আর্ত চিৎকার শুনে অকস্মাৎ সবাই ঘুম থেকে ছেলে মেয়ে সহ জেগে উঠতাম। সেই ভয়াল ও ভয়ঙ্কর চিৎকারে কান্নার রোল ভেসে আসত। “বাঁচাও, আমাদের বাঁচাও, তোমাদের পায়ে পড়ি, আমাদের বাঁচাও, পানি দাও, এক ফোটা পানি দাও, পানি পানি।”



মিলিটারী ট্রাক ও ভ্যানে প্রতিদিন পাঞ্জাবী সেনারা রাজধানীর বিভিন্ন জনপদ, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে নিরীহ বাঙ্গালী যুবক ছেলেদের চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে হেডকোয়ার্টারে অফিসের কক্ষে কক্ষে জমায়েত করে অকথ্য অত্যাচার চালাতো। হেড কোয়ার্টারে অফিসের উপর তালায় আমাদের প্রবেশ করা একেবারে নিষিদ্ধ ছিল। দিনের বেলায় পুলিশ লাইনে প্যারেডের আওয়াজের জন্য উপরতলা থেকে নির্যাতিত বন্দীদের কোন আর্তনাদ আমরা শুনতে পেতাম না। সন্ধ্যার পর আমরা আমাদের নির্দিষ্ট কোয়ার্টার থেকে তাদের আর্তনাদ শুনতে পেতাম। সন্ধ্যার পর পাক সেনারা বিভিন্ন প্রকারের বন্দীদের উপর অত্যাচার চালিয়ে যেত। আর লোহার রডের উপর ঝুলন্ত বালিকা, যুবতী নারী ও রূপসী রমণীদের উপর চলতো অবিরাম ধর্ষণ, নির্মম অত্যাচার। বন্দীদের হাহাকারে আমরা অনেক সময় একবারে দিশাহারা হয়ে পড়তাম, অনেক সময় প্রতিবাদ করতে চাইতাম। কিন্তু ওদের শক্তির মোকাবেলায় আমাদের কিছুই করার ছিল না, আমরা কিছুই করি নাই, করতে পারি নাই। এভাবে প্রতিদিন ‘মুক্তি হায়’ বলে যে সব নিরীহ বাঙ্গালী ছেলেদের চোখ বেঁধে পুলিশ লাইনে এনে হেড কোয়ার্টার অফিসে জমায়েত করা হত রাতের শেষে পরের দিন সকালে আর এ সকল বন্দীদের দেখা যেত না এবং সে স্থানে নতুন বন্দীদের এনে রাখা হত।

স্বাক্ষর/-

খলিলুর রহমান

২-৬-১৯৭৪


।। ৭ ।।
মতিউর রহমান
সাব-ইন্সপেক্টর অব পুলিশ
রমনা থানা, ঢাকা



১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ আমি সারাদিন থানা সংলগ্ন পুলিশের সি, আই, অফিসের জন্য কাজ করছিলাম। রাত দশটা পনের মিনিট। আমার টেবিলের উপর রাখা টেলিফোনটি বেজে উঠল। কমলাপুর পুলিশের জি, আর, পি থেকে আমার এক বিশিষ্ট বন্ধু টেলিফোনে আমাকে জানালো যে, ঢাকা সেনানিবাস থেকে ভারী অস্ত্র ও কামান সেট করা সত্তরটি আর্মি ট্রাক ভর্তি সশস্ত্র পাক হানাদার এয়ারপোর্ট রোড ধরে ঢাকা শহরে প্রবেশ করছে। রাত প্রায় এগারোটার সময় পাক হানাদাররা আমাদের থানার উপর আক্রমন করে। ওরা এসেই ভারী মেশিনগানের সাহায্যে বৃষ্টির মত আমাদের থানায় গুলি বর্ষণ করতে থাকে। থানার সামনে নিয়োজিত আমাদের সশস্ত্র প্রহরী ও কতিপয় পুলিশ অফিসার পশুদের অবিরাম গুলিবর্ষণে বেশীক্ষণ টিকে থাকতে পারে নাই। পাক সেনারা থানায় ঢুকেই তাদের সবাইকে বন্দী করে। এরপর বহু পাক সেনা আমাদের দিকে গুলি বর্ষন করতে করতে অগ্রসর হতে থাকলে আমরা গুলিবর্ষন শুরু করি এবং প্রাণপণে পশুদের প্রতিরোধ করতে থাকি। এভাবে আমরা সারারাত শত্রুসেনাদের প্রতিরোধ করতে থাকি। সকালে সাড়ে পাঁচটায় ওরা থানার কলোনী সশস্ত্র ভাবে ঘেরাও করে ব্যাপক তল্লাশী আরম্ভ করে এবং আমাদের সবাইকে বন্দী করে। আমরা থানায় পুলিশের সাধারণ সিপাহী, উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসারসহ মোট ৪৫ জন ওদের হাতে বন্দী হয়েছিলাম। আমাদের সাথে বাইরের আরও ৫০ জন পুলিশ বন্দীকে রাখা হয়েছিল। আমাদের সবাইকে থানার সম্মুখে পশ্চিম দিকে মাঠে বেদম প্রহার করতে করতে, বুটদ্বারা লাথি মারতে মারতে নিয়ে গিয়ে “নজর নিচে দেকার মিটেট মে শো যাও” বলে আমাদেরকে উপড় করে লাথি মেরে শুইয়ে দেয়া হয়। সকাল ছয়টা থেকে নয়টা পর্যন্ত তিন ঘন্টা আমাদেরকে বেদম পিটানো হয়। হাতের বেত, বন্ধুকের নল এবং যার হাতে যা ছিল তাই দিয়ে আমাদের উপর এলোপাতাড়ি পিটুনি চলতে থাকে। “শালা মালাউন, শোয়ার কা বাচ্চা আভী জয় বাংলা বলতা নাই, শালা কাফের, হিন্দুকা লাড়কা, তোমহারা মুজিবর বাবা আভি কাহা হায়?” বলে অকথ্য গালাগালি করতে থাকে আর অবিরামভাবে প্রহার করতে থাকে। আমার ঘরে নৌকার সুন্দর আর্ট করা গ্রাম বাংলার একটি দেয়াল চিত্র দেখে আমাকে আরও বেশি প্রহার করতে থাকে। আমাদের সি, আই, মিঃ মোয়াজ্জেম হোসেন, লজ্জায় এবং অপমানে বিমুঢ় হয়ে সারাদিন হাউমাউ করে পাগলের মত কাঁদতে থাকেন। তার দু’ছেলেও তার সাথে বন্দী হয়ে চরম অত্যাচারের শিকার হয়েছিল। তিন ঘন্টা থানার সামনের মাঠে বেদম পিটুনি দেওয়ার ফলে আমাদের বহু সহকর্মী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। কারো মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছিল, কারো কারো হাত পা ভেঙ্গে গিয়েছিল। এরপর আমাদের প্রায় ৪০ জনকে এলোপাতাড়ি পিটাতে পিটাতে থানার একটি আট ফুট প্রশস্ত ও দশ ফুট চওড়া ছোট কামরায় ঠাসাঠাসি করে চাউলের বস্তার মত গুদামজাত করে রাখা হয়। আমরা বেদমভাবে প্রহৃত হওয়ার পর থানার সম্মুখে প্রাঙ্গনে মানুষের তাজা রক্তে ভরপুর দেখেছি। আমাদের থানা হাজতে একজন আসামী ছিল তাকেও গুলি করা হয়। কিন্তু সে মরে নাই, আধমরা ভাবে ভীষণ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। আমরা ছোট কামরায় প্রবেশ করার সময় দেখলাম আমাদের দু’জন শহীদ সিপাহীর লাশ থানার পিছনের মাটিতে পোতা হচ্ছে। সারারাত আমরা সকল সিপাহী বন্দী দাঁড়িয়ে থেকে যন্ত্রণায় কেঁদেছি, সাংঘাতিক যন্ত্রণা ভোগ করেছি। ওরা মেশিনগান নিয়ে সর্বক্ষন প্রহরায় ছিল।



পরের দিন ২৭শে মার্চ সকাল দশটার সময় সকল বন্দীকে বের করে গরুর মত পিটাতে পিটাতে থানার পূর্বদিকে নিয়ে গিয়ে ছোট হাউজের দাঁড় করিয়ে রেখে বলে, “যাও শালা লোগ পিয়ো”। ঐ পানিতে পশুরা নেমে সকালে থেকে গোসল করায় পানি দূষিত ও বিষাক্ত হয়ে গিয়েছিল। আমাদের বন্দীদের মধ্যে কতক সেই পচা পানি দিয়েই হাত মুখ ধুয়ে নিল, তৃষ্ণায় একেবারে দিশাহারা হয়ে অনেকে পানি খেয়ে নিল, অনেকেই সে পানি স্পর্শ করতে পারলো না। আমরা পানির হাউজের সামনে যাওয়ার সময় লক্ষ্য করলাম পূর্বের দিন যেখানে আমাদের দু’জন শহীদ সিপাহীদের লাশ পোতা হয়েছিল সেখানে তাদের লাশ নেই, সামনেই দেখলাম সে দু’জন শহীদ সিপাহীর রক্ত মাখা পোশাক এক জায়গায় গুটিয়ে রাখা হয়েছে। পানি খাওয়ার পর আমাদেরকে পুনরায় সেই ছোট কামরায় গাদাগাদি করে রাখা হয়। কিছুই খেতে দেয়া হয় নাই দু’দিন। আমাদের কেউ কেউ ক্ষুধায় একেবারে কাতর হয়ে খেতে দেওয়ার জন্য প্রার্থনা জানালে ওরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলতো, “তোমহারা মুজিবর বাবা খানা ডেজেগো”



১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ সকাল থেকেই ওরা তিন চার জন করে কামরা থেকে নিয়ে পাশের কামরায় বেদম পিটুনি আরম্ভ করলো। এভাবে আমাদের সকল বন্দীদের উপর অসহ্য মার পিট চললো। আমি সেই কামরায় প্রবেশ করার পর পরই দেখলাম দশ বার জন জল্লাদ পশু। ওদের হাতের ছোট ছোট লাঠি। বন্দুকের বাট, বুট, যার হাতে যা ছিল তাই দিয়ে নির্মম ভাবে পিটাতে থাকে। আমি ওদের মারে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। এরপর আমাকে পাশের কামরায় নিয়ে পুলিশের কোথায় কি আছে, কত পুলিশ অফিসার থানায় আছে, পুলিশ কি মিটিং করেছিল ইত্যাদি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে। কিন্তু অসহ্য পিটুনি সহ্য করার পরও আমি কোন ব্যাপারেই সঠিক তথ্য ওদেরকে সরবরাহ করি নাই।



১৯৭১ সনের ২৭শে মার্চ আমরা সকল বন্দীরা যন্ত্রণায় ছটফট করছিলাম। বিকাল তিনটার সময় টুকরীতে করে সামান্য ভাত এনে আমাদের জানালার সামনে ধরে রেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলতে থাকে, “শালা লোগ চাউল খায়েগা, চাউল।” সে ভাত আমাদেরকে খাওয়াবার জন্য আনা হতো না, বরং আমাদেরকে নিয়ে বিদ্রুপ করার জন্যই আমাদের জানালার সামনে ধরে রাখা হতো। ওরা জানালার সামনে সামান্য কিছু ভাত ধরে ঠাট্টা তামাশা করতে থাকলেও আমাদের কোন ক্ষুধার্ত বন্দীই ওদের বিদ্রুপের সামনে কোন কথাই বলে নাই। ওরা ভাত নিয়ে এমন উলঙ্গভাবে আমাদেরকে নিয়ে বিদ্রুপ করে চলে যাওয়ার পর বন্দীখানায় কান্নার রোল পড়ে যায়। আমরা সবাই কাঁদতে থাকি হাউমাউ করে। ওরা সেই ভাতগুলি আমাদেরকে দেখিয়ে বন্দীখানার সামনের গাছের নিচে ফেলে দেয়। সারারাত আমরা সকল বন্দী কাঁদতে কাঁদতে পার করে। পশুরা মেশিনগান নিয়ে সব সময় আমাদের পাহারা দিচ্ছিল।



পরের দিন ২৮ শে মার্চ আমরা জানালা দিয়ে দেখতে পাই পশুরা থানার অস্ত্রাগার ও মালখানার সকল অস্ত্র ও মালামাল সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ওদের মটর ট্রাকে করে। হাজতে রাখা আমাদের পুর্ববর্তী আহত বন্দীকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয় আমরা জানতে পারি নাই।



২৯ শে মার্চ পর্যন্ত আমাদেরকে সারাদিন বন্দিখানায় এভাবেই দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। একফোটা পানিও দেওয়া হয় নাই কোন বন্দীকে, কোন খাদ্যও দেয়া হয় নাই।

২৯শে মার্চ বিকাল ৪ টায় তৎকালীন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার ইমাদ আহমেদ চৌধুরী রমনা থানায় আসেন এবং আমাদেরকে তার সম্মুখে হাজির করা হয়। এমন সময় আমাদের এক বৃদ্ধ সিপাহী ক্ষুধায় এবং তৃষ্ণায় জ্ঞানহারা হয়ে মাটিতে পড়ে যান। ইমাদ আহমেদ চৌধুরী অশ্রুভরা চোখে বন্দীদের দেখছিলেন। আমার সামনে এসে আমার ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখে তিনি আমাকে ধরে হাউ মাউ করে কেঁদে ফেললেন। পশুদের বুটের লাথি, বেয়নেটের আঘাত ও লাঠি এবং বেতের এলোপাতাড়ি আঘাতে আমার সমস্ত শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে রক্ত ঝরছিল। আমাদের পুলিশ সুপার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে আমাদেরকে বললেন যাদের নিকটবর্তী বাসা আছে তারা বাসায় চলে যান, আর যাদের কোন বাসা নাই তারা থানার সামনে দারানো ট্রাকে চড়ে মিল ব্যারাকে চলে যান।” আমি থানার বাসায় গিয়ে দেখলাম, সব লুট হয়ে গেছে, পাক পশুরা সব নিয়ে গেছে। খাওয়ার কিছুই ছিল না, না খেয়ে আহত ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত দেহ নিয়ে খোদাকে আমার অত্যাচারের সাক্ষী রেখে শুন্য খাটে এলিয়ে পড়লাম। পরদিন সকালে আমি রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালের দিকে রওয়ানা হই অনেক কষ্টে। পথে দেখলাম তখনও রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পুলিশের ব্যারাক দাউ দাউ করে জ্বলছে, জ্বলছে পুলিশের পোশাক-পরিচ্ছদ আসবাবপত্র। ব্যারাকের পিছনেই পাকা যায়গায় দেখলাম চাপ চাপ রক্ত শুকিয়ে আছে। ব্যারাকের মাঝখানে দেখতে পেলাম পায়ে বুট দেওয়া দু’টি পুলিশের লাশ তখনও জ্বলছে। পশুদের ভয়ে আর সামনে এগোতে সাহস পেলাম না। অন্য রাস্তা ধরে তাড়াতাড়ি হাসপাতালের দিকে পা’ বাড়ালাম।

স্বাক্ষর/-

মতিউর রহমান

২-৩-১৯৭৪







।। ৮ ।।

মোহাম্মদ হোসেন

পুলিশের সিপাহী

রমনা থানা, ঢাকা



১৯৭১ সনের ২৫ শে মার্চ রমনা থানার একজন সাধারণ সিপাহী হিসেবে থানার সম্মুখের প্রাঙ্গণে প্রহরারত ছিলাম। রাত দশটায় আমার কর্তব্য শেষ করে আমি ব্যারাকে চলে যাই। কিছুক্ষন পরই আমি থানার চারদিকে ভীষণ হৈচৈ, দৌড়াদৌড়ি ও গোলমালের আওয়াজ শুনে থানার সামনে দাঁড়িয়ে দেখি ইট, পাথর ও গাছ দিয়ে জনতা রাস্তার উপর বেরিকেড তৈরী করছে। এ সময় আমাদের থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার কাজী মহিউদ্দিন সাহেব থানার অস্ত্রাগার থেকে প্রত্যেকের প্রয়োজনমত অস্ত্র দিয়ে দেন। আমরা যার যা প্রয়োজন সে মত অস্ত্র নিয়ে পাক হানাদারদের হামলা প্রতিরোধ ও প্রতিহত করার জন্য থানার চারদিকে পজিশন নেই। আমরা সবাই সেদিন এই শপথ গ্রহন করেছিলাম যার হাতে যা আছে তা-ই দিয়ে পাক-পশুদের মোকাবিলা করব, প্রান দিব কিন্তু পিছু হটবো না। থানার চার দিকে আমরা সকল পুলিশ সিপাহী ও পুলিশের সকল অফিসার সশস্ত্রভাবে পাক-পশুদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। অল্পক্ষন পরে পাক পশুরা চারদিক থেকে বৃষ্টির মত গুলি বর্ষণ করতে করতে থানায় প্রবেশ করার চেষ্টা করে। আমাদের হাতে সামান্য রাইফেল দিয়ে ওদের প্রানপন প্রতিরোধ করতে থাকি। এভাবে পাক-পশুদের অজস্র গুলিবর্ষণের মুখে আমরা সারারাত ওদের প্রতিরোধ করেছি কিন্তু আত্ম-সমর্পণ করি নাই। আর প্রতিরোধ করার সময় সহস্র গুলিবর্ষণের মুখেও আমাদের কোন সিপাহী বা অফিসার আত্মসমর্পণ করার জন্য কোন দুর্বলতা প্রকাশ করেন নাই। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরা এই দৃঢ়তা দেখিয়েছি, “প্রানপন পশুদের প্রতিহত করবো, কিন্তু পিছু হটব না।”



অতি প্রত্যুষে পশুরা থানার পিছনে যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা ওদের প্রতিহত করছিলাম সেখানে প্রতিটি ঘরে ঘরে ব্যাপক তল্লাশী আরম্ভ করে দেয় এবং প্রত্যেক ঘর থেকে আমাদের থানার সশস্ত্র সিপাহীদের বন্দী করে গরুর মত এলোপাতাড়ি পিটাতে পিটাতে থানার পিছনের পুলিশ ব্যারাকে সামনে এনে জড়ো করে বন্দীদের অবিরামভাবে পিটাতে থাকে। ওরা আমাদেরকে উন্মত্তভাবে পিটাচ্ছিল আর বলছিল, “শালা মালাউনকা বাচ্চা, হিন্দুকা লাড়কা, শোয়ারকা বাচ্চা শালা তোমহারা মুজিব বাবা আভি কাহা হায়, শালা হারামী, আভি শালা জয় বাংলা বোলতা না-ই।” ওদের এলোপাতাড়ি পিটুনিতে আমাদের সিপাহীরা অনেকে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যান, অনেকের মুখমন্ডল রক্তাক্ত ছিল, কারো হাত-পা একেবারে ভেঙ্গে গিয়েছিল, আমাদের অধিকাংশ বন্দীর শরীরে কোন কাপড় ছিল না। ওদের নির্মম মারের চোটে কখন যে পরণের বস্ত্র কোথায় পড়ে গিয়েছিল বলতে পারবো না কেউ। আমাদের সকলকে আবার পিটাতে পিটাতে বুটের লাথি মারতে মারতে আমাদের থানার সি, আই, সাহেবের কামরায় জুড়ে বসা পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেনের সামনে আমাদের প্রায় উলঙ্গ দাঁড় করানো হয়। ক্যাপ্টেন তখন কর্কশ কন্ঠে চিৎকার করে বলছিল, “সব শালাকো এক গুলিতে খতম কার দেও”।



এমন সময় জনৈক পাঞ্জাবী মেজর সেখানে উপস্থিত হতে জানান যে, “জি. ও. সি সাহেব বোলা হায় ইন লোগকে রাখ দাও, গোলি মাত করো, বাদমে দেখা যায়েগা।” আমাদেরকে তখন গুলি করা হয় না, বুটের লাথি মারতে মারতে আমাদেরকে থানার সামনে দশ ফুট চওড়া ও আট ফুট লম্বা একটি ছোট কামরায় গরু ছাগলের মত গাদাগাদি করে এনে রাখা হয়। এ ছোট কামরায় আমরা পুলিশ ও পুলিশের উচ্চ পদস্থ অফিসার সহ মোট ৪৭ জন ছিলাম। আমাদের কামরার চারদিকে পশুরা মেশিনগান নিয়ে প্রহরায় মোতায়েন ছিল সবসময়। বেদম পিটুনি খাওয়ার পর বন্দীরা সবাই কান্নাকাটি করছিল, আমাদের সি, আই মোয়াজ্জেম হোসেন খান, অপমানে এবং বেদমভাবে নির্যাতিত হওয়ায় হাউমাউ করে কাঁদছিলেন। তার দুই ছেলেও নির্মমভাবে অত্যাচারিত হয়ে রক্তাক্ত আহত শরীর নিয়ে উলঙ্গভাবে দাঁড়িয়েছিল। আমরা থানার সেই ছোট কামরায় গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থেকে সব সময় ভীতসন্ত্রস্তভাবে মৃত্যুর প্রহর গুনেছি।



এভাবে ২৭শে, ২৮শে ও ২৯শে মার্চ চলে যায়। আমাদেরকে তৃষ্ণা মিটানোর জন্য এক ফোটা পানি দেওয়া হয় নাই, আর কোন খাদ্যও দেয়া হয় নাই।



আর ২৯শে মার্চ বিকালে তৎকালীন জেলা পুলিশ সুপার ই, এ চৌধুরী সাহেব রমনা থানায় এসে আমাদের নাম তালিকাভুক্ত করলেন এবং আমাদের জন্য কিছু টাকা দিলেন নিজ পকেট থেকে। কিন্তু তখন বাহিরে কার্ফু থাকায় আমরা বেরুতে পারি নাই।



পরের দিন ৩০শে মার্চ আমি আমার তেজগাঁওস্থিত বাড়িতে চলে যাই। এরপর আমি বাংলার মুক্তি সংগ্রামকে সাহায্য করার একমাত্র আকাঙ্খায় এবং আমার পরিবারের নিরাপত্তা ও অস্তিত্ত্ব রক্ষার উদ্দেশ্যে আমি পুনরায় থানায় যোগদান করি। আমাদের থানা তখন বিহারী রাজাকার ও পাকসেনাদের দখলে ছিল। ওরাই থানার সর্বময় প্রভু ছিল। আমাদের হাতে কোন রাইফেল দেয়াও হতো না, শুধু লাঠি দেয়া হতো মাত্র। আমরা দেখেছি, প্রতিদিন অসংখ্য বাঙ্গালী যুবক, বৃদ্ধকে, অসহায় মানুষকে মুক্তিবাহিনীর মিথ্যা অজুহাতে ধরে থানায় আনা হতো, প্রতিদিন বিহারীরা এই নিরীহ বন্দীদের উপর অত্যাচার চালাতো। অনেক বন্দীকে সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হতো। যে সকল বন্দীকে থানা থেকে নিয়ে যাওয়া হতো তাদের অধিকাংশই ফিরে আসতো না। ওদেরকে মেয়ে ফেলা হতো। পাক সেনা বিহারি ও বেইমান বাঙ্গালী রাজাকাররা এভাবে ১৯৭১ সনের নভেম্বর মাস পর্যন্ত অত্যাচার চালাতে থাকে। ডিসেম্বরে মুক্তি বাহিনী ও মিত্র শক্তির সম্মিলিত আগমনের মুখে পাক পশুরা রাজারবাগের দিকে পালিয়ে যায়।



আমরা এ থানায় কর্তব্যরত থাকাকালে মুক্তি বাহিনীকে নিয়মিত সংবাদ দিয়েছি, বন্দীদের সাহায্য করেছি- এ ভাবে আমরা বাংলার মুক্তি সংগ্রামকে মনে-প্রানে কার্যকলাপে সবদিক দিয়ে সর্বতোভাবে যথাসাধ্য সাহায্য করেছি।

স্বাক্ষর/-

মোহাম্মদ হোসেন

২১-১-৭৪



।। ৯ ।।

মোঃ সাহেব আলী

সুইপার ইন্সপেক্টর

ঢাকা পৌরসভা,ঢাকা।



আমি ১৯৭১ সন থেকে ঢাকা পৌরসভার অধীনে সুইপার ইন্সপেক্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। ১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ আমি আমার সুইপারের দল নিয়ে দায়িত্ব পালন করে সন্ধ্যায় ৪৫/১, প্রসন্ন পোদ্দার লেনস্থিত আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর বাড়িতে অবস্থান করছিলাম। রাত নয়টার দিকে আমি ঢাকা ইংলিশ রোডের দিকে বের হয়ে দেখলাম রাস্তাঘাট চারিদিকে থমথমে, সকল প্রকার যানবাহন দ্রুত গন্তবস্থলের দিকে যেতে দেখলাম। ছাত্র জনতাকে রাস্তায় বেরিকেড তৈরী করতে দেখলাম। প্রতিরোধ তৈরীতে ব্যস্ত ছাত্র জনতার নিকট জানতে পারলাম ঢাকা সেনানিবাস থেকে পাক সেনারা রাজধানী ঢাকার দিকে সামরিক ট্রাক নিয়ে এগিয়ে আসছে। পাক পশুদের প্রতিরোধ করার জন্য ছাত্র জনতার এই প্রচেষ্টা ও প্রয়াস। আমি সবকিছু দেখে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে বাসায় চলে গেলাম। রাত সাড়ে

এগারটার দিকে রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পুলিশ হেডকোয়ার্টার, পুলিশ অফিস ও মালিবাগ, গোয়েন্দা অফিসের দিকে আকাশ ফাটা গোলাগুলির শব্দ শোনার সময় ঢাকা শাঁখারী বাজার প্রবেশ পথে বাবু বাজার ফাঁড়িতে ভীষণ শেলিংয়ের গর্জ্জন শুনলাম। আমি নিকটবর্তী নয়াবাজার সুইপার কলোনীর দোতলায় দাঁড়িয়ে চতুর্দিকে গোলাগুলির ভীষণ গর্জ্জন শুনলাম।



২৬শে মার্চ অতি প্রত্যুষে আমি সুইপার কলোনীর দোতলা থেকে দৌঁড়ে নেমে বাবুবাজার ফাঁড়িতে গিয়ে দেখলাম ফাঁড়ির প্রবেশ পথ, ভেতরে, চেয়ারে বসে, উপুড় হয়ে পড়ে থাকা দশ জন পুলিশের ইউনিফরম পরা গুলির আঘাতে ঝাঁজরা ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে। আমি ফাঁড়ির ভেতরে প্রবেশ করে দেখলাম ফাঁড়ির চারিদিকের দেয়াল হাজারো গুলির আঘাতে ঝাঁজড়া হয়ে আছে। দেয়ালের চারিদিকে মেঝেতে চাপ চাপ রক্ত, তাজা রক্ত জমাট হয়ে আছে, দেখলাম কেউ জীভ বের করে পড়ে আছে, কেউ হাত পা টানা দিয়ে আছে, প্রতিটি লাশের পবিত্র দেহে অসংখ্য গুলির আঘাত। মানবতার অবমাননা ও লাঞ্চনার বীভৎস দৃশ্য দেখে আমি একটি ঠেলগাড়ীতে করে সকল লাশ ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালে লাশ ঘরে রেখে আবার ঠেলাগাড়ী নিয়ে শাঁখারীবাজারে প্রবেশ করে একবারে পূর্বদিকে ঢাকা জজকোর্টের কোণে হোটেলের সংলগ্ন রাস্তায় দশটি ফকির মিসকিন ও রিকশা মেরামতকারী মিস্ত্রীর উলঙ্গ ও অর্ধ উলঙ্গ লাশ উঠালাম। কোন হিন্দুর লাশ আমি রাস্তায় পাই নাই। সবকটি লাশ মুসলমানের ছিল। রাস্তায় পড়ে থাকা গুলিতে ঝাঁঝরা দশটি লাশ ঠেলাগাড়ীতে তুলে আমি মিটফোর্ড নিয়ে গিয়েছি। মুসলমানের লাশ এভাবে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেওয়া যায় না। তাই আমরা স্থানীয় জনতা সবাই মিলে লাশ গুলি তুলে মিটফোর্ডে জমা করেছি। রাজধানী ঢাকার সর্বত্র কার্ফূ থাকা সত্ত্বেও গণহত্যার সেই বীভৎস দৃশ্য দেখার জন্য ছাত্র জনতা রাস্তায় রাস্তায় বের হয়ে পড়লে পাক সেনারা ঘোষনা করে কার্ফূ বলবৎ রয়েছে, কেউ রাস্তায় বের হলে গুলি করা হবে। পাক সেনাদের এই ঘোষনার পর আমরা সরে পড়লাম। দিনের শেষে বেলা পাঁচটার সময় তাঁতিবাজার, শাঁখারীবাজার, এবং কোর্ট হাউজ স্ট্রীট এলাকায় পাক সেনারা আগুন ধরিয়ে দেয়। সাথে সাথে চলতে থাকে অবিরাম গুলি বর্ষণ। সারারাত পাক সেনারা তাঁতিবাজার, শাঁখারীবাজার ও গোয়াল নগর এলাকায় অবিরাম গুলি বর্ষণ করতে থাকে।



১৯৭১ সনের ২৭শে মার্চ বেলা একটার সময় পাক সেনারা নওয়াবপুর থেকে ইংলিশ রোডের বাণিজ্য এলাকার রাস্তায় দুদিকের সকল দোকানপাটে আগুন ধরিয়ে দেয়। বেলা তিনটা পর্যন্ত ইংলিশ রোডের রাস্তায় দুদিকে আগুন জ্বলতে থাকে। আগুনের সেই লেলিহান শিখায় পার্শ্ববর্তী এলাকার জনতা আশ্রয়ের জন্য পালাতে থাকে। পালাতে গিয়ে পাক সেনাদের গুলিতে অনেকে প্রাণ হারায় । বেলা তিনটায় পাক সেনারা তাঁতিবাজারের বাহির পথ ও মালিবাগের পুলের পশ্চিম পার্শ্বে হিন্দু মন্দিরের উপর শেলিং করে মন্দিরটি ধ্বংস করে দেয়। ইংলিশ রোদের আগুন বাসাবো এলাকাকে অতিক্রম করে সুইপার কলোনীর দিকে ধেয়ে আসতে থাকলে আমি সুইপারদের কলোনীর পানি রিজার্ব করে রাখার নির্দেশ দেই। পাক সেনাদের ডিঙ্গিয়ে সকল সুইপার মিলে সুইপার কলোনীটি রক্ষা করার জন্য অগ্রসর হলে আমরা পাক সেনাদের গুলির মুখে চলে আসি।



১৯৭১ সনের ২৮শে মার্চ সকালে রেডিও মারফত সকল সরকারী ও বেসরকারী কর্মচারীকে অবিলম্বে কাজে যোগদান করতে হবে এ নির্দেশ পেয়ে পরদিন আমি সকাল ১০টার সময় ঢাকা পৌরসভায় ডিউটি রিপোর্ট করলে ঢাকা পৌরসভার তৎকালীন কন্সারভেন্সী অফিসার মিঃ ইদ্রিস আমাকে ডোম নিয়ে অবিলম্বে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় পড়ে থাকা লাশ তুলে ফেলতে বলেন। ইদ্রিস সাহেব অত্যন্ত ক্রুদ্ধভাবে বলতে থাকেন সাহেব আলী বের হয়ে পড়, যদি বাঁচতে চাও তবে ঢাকার রাজপথ ও বিভিন্ন এলাকা থেকে লাশ তোলার জন্য বের হয়ে পড়। কী বাঁচবেনা, কাউকে রাখা হবে না, সবাইকে পাক সেনাদের গুলি বর্ষণে মরতে হবে, সবাইকে কুকুরের মত হত্যা করা হবে। পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান মেজর সালামত আলী খান শুর আমাদের সাথে কুকুরের মত উত্তেজিত হয়ে, অত্যন্ত কর্কশ স্বরে ক্রুদ্ধভাবে বকাবকি করতে থাকেন। সেখানে আমি, সুইপার ইন্সপেক্টর আলাউদ্দিন, সুইপার ইন্সপেক্টর কালীচরণ, সুইপার সুপারভাইজার পাঞ্চাম, সুইপার ইন্সপেক্টর আওলাদ হোসেন আমরা পাঁচজন উপস্থিত ছিলাম। আমাকে পরদেশী ডোম, লেমু ডোম, ডোম গোলাপ চান, দুঘিলা ও মধু ডোমকে নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে লাশ তুলে স্বামীবাগ আউটকলে ফেলতে বলা হয়।



১৯৭১ সনের ২৯শে মার্চ আমার দল ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালের লাশ ঘর থেকে দুই ট্রাক লাশ তুলেছে। আমার দল যে সকল লাশ তুলেছে আমি স্বচক্ষে তা দেখেছি। অধিকাংশই ছিল সরকারী কর্মচারী, পুলিশ, আনসার ও পাওয়ারম্যানদের খাকী পোষাক পরা বিকৃত লাশ। লাশ তুলতে তুলতে পরদেশী নামক জনৈক ডোমের হাতে এক ষোড়শী রুপসীর উলঙ্গ ক্ষতবিক্ষত লাশ দেখলাম, দেখলাম সেই যুবতীর পবিত্র দেহে অসংখ্য ক্ষত চিহ্ন, তার বুক থেকে স্তন সজোরে তুলে নেওয়া হয়েছে, লজ্জাস্থান ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে, পিছনের মাংস তুলে নেয়া হয়েছে। হরিণের মত মায়াভরা মধুময় বড় বড় চোখ ঘুমিয়ে আছে, সারা দেহে সৃষ্টিকর্তা যেন দুধের সর দিয়ে আবৃত করে দিয়েছে, মাথায় কালো কালো চুল তার কোমর পর্যন্ত লম্বা হয়ে পড়ে ছিল, তার দুই গালে আঘাতের চিহ্ন দেখলাম। পরক্ষণেই দেখলাম দশ বছরের এক কিশোরীর উলঙ্গ ক্ষতবিক্ষত লাশ। অপরুপা রুপসী ফলের মত টক টকে চেহারা, সারা দেহে বুলেটের আঘাত।



১৯৭১ সনের ৩০শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল থেকে ভারপ্রাপ্ত পাক সেনাদের মেজর পৌরসভায় টেলিফোনে সংবাদ দেন রোকেয়া হলের চারিদিকে মানুষের লাশের পচা গন্ধে বসা যাচ্ছে না, অবিলম্বে ডোম পাঠিয়ে লাশ তুলে ফেলা হোক। আমি ছয়জন ডোম নিয়ে রোকেয়া হলে প্রবেশ করে রোকেয়া হলের সমস্ত কক্ষে তন্ন তন্ন করে খুঁজে কোন লাশ না পেয়ে চারতলা চাদের উপর গিয়ে আঠার বছরের জনৈক রুপসী ছাত্রীর উলঙ্গ লাশ দেখতে পেলাম। আমার সাথে দায়িত্বরত জনৈক পাক সেনাকে জিজ্ঞাসা করলাম এ ছাত্রীর দেহে গুলির কোন আঘাত নাই, দেহের কোন স্থানে কোন ক্ষত চিহ্ন নাই অথচ মরে চিৎ হয়ে পড়ে আছে কেন? সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলল আমরা সকল পাক সেনা মিলে ওকে ধর্ষণ করতে করতে মেরেছি। পচা-ফুলা সেই রুপসীর উলঙ্গ দেহ পড়ে আছে দেখলাম। ডাগর ডাগর চোখ ফুলে বের হয়ে আছে, মাথার চুল নিকটেই ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, লজ্জাস্থান তার পেট থেকে ফুলে অনেক উপরে উঠে আছে, যোনিপথ রক্তাক্ত। তার দুইদিকে গালে পশুদের কামড়ের চিহ্ন দেখলাম, বক্ষের স্তনে মানুষের দাঁতের দংশনের চিহ্ন দেখলাম। আমি একটি চাদর দিয়ে লাশটি ঢেকে দিয়ে নামিয়ে নিয়ে আসি, রোকেয়া হলের সার্ভেন্ট কোয়ার্টারের ভেতরে প্রবেশ করে পাঁচ জন মালিদের স্ত্রী পরিজনদের পাঁচটি লাশ এবং আটটা পুরুষের লাশ (মালি) পেয়েছি। লাশ দেখে মনে হল মৃত্যুর পূর্বক্ষণে সবাই শুয়ে ছিল। আমি ট্রাক নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিববাড়ীর তেতলা থেকে জনৈক হিন্দু অধ্যাপক, তার স্ত্রী ও দুই ছেলের লাশ তুলেছি। স্থানীয় জনতার মুখে জানতে পারলাম তাঁর দুই মেয়ে বুলেটবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে আছেন। সংগৃহীত লাশ স্বামীবাগ আউটকলে ফেলে দিয়ে আমরা ট্রাক নিয়ে ঢাকা বুড়ীগঙ্গা নদীতে ভাসমান হাত-পা, চোখ বাঁধা অসংখ্য যুবকের লাশ তুলেছি। আমরা ৩০শে মার্চ ঢাকা বুড়ীগঙ্গা নদী থেকে তিন ট্রাক লাশ তুলে স্বামীবাগে ফেলেছি। পাক সেনারা কুলি দিয়ে পূর্বেই সেখানে বিরাট বিরাট গর্ত করে রেখেছিল।



পরের দিন মোহাম্মদপুর এলাকার জয়েন্ট কলোণির নিকট থেকে সাতটি পচা-ফুলা লাশ তুলেছি। ইকবাল হলে আমরা কোন লাশ পাই নাই। পাক সেনারা পূর্বেই ইকবাল হলের লাশ পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেয়। বস্তি এলাকা থেকে জগন্নাথ হলে আশ্রয়ের জন্য ছুটে আসা দশ জন নর-নারীর ক্ষতবিক্ষত লাশ তুলেছি। ফেরার পথে আমরা ঢাকা হলের ভেতর থেকে চার জন ছাত্রের উলঙ্গ লাশ তুলেছি।



১৯৭১ সনের ১লা এপ্রিল আমরা কচুক্ষেত, ড্রাম ফ্যাক্টরী, তেজগাঁও, ইন্দিরা রোড, দ্বিতীয় রাজধানী এলাকাস্থ ঢাকা বিমান বন্দরের অভ্যন্তরে, ঢাকা স্টেডিয়ামের পূর্ব দক্ষিণ দিক থেকে কয়েকজন ছাত্রের পচা লাশ তুলেছি। এরপর থেকে প্রতিদিন আমরা বুড়ীগঙ্গা নদীর পাড় থেকে হাত-পা, চোখ বাঁধা অসংখ্য যুবকের লাশ তুলেছি। রায়ের বাজার ইটখোলায় আমরা কয়েক হাজার বাঙ্গালী যুবকের লাশ তুলেছি। মিরপুর এক নম্বর সেকশনের রাস্তার পার্শ্বে ছড়ানো, ছিটানো বাঙ্গালী যুবকের লাশ তুলেছি। মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল কলেজের হল থেকে দশ জন ছাত্রের ক্ষতবিক্ষত লাশ তুলেছি। রায়ের বাজার রাস্তা, পিলখানা, গণকটুলি, ধানমণ্ডি, কলাবাগান, কাঁঠাল বাগান, এয়ারপোর্ট রোডের পার্শ্ববর্তী এলাকা, তেজগাঁও মাদ্রাসা থেকে অসংখ্য মানুষের পচা-ফুলা লাশ তুলেছি। অনেক লাশের হাত-পা পেয়েছি মাথা পাই নাই। মেয়েদের লাশ সবই উলঙ্গ ও ক্ষতবিক্ষত পেয়েছি।



কিছুদিন পর আমি কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মত কারখানায় গিয়ে সাধনা ঔষধালয়ের মালিক প্রফেসর যোগেশচন্দ্র বাবুর বেয়নেটের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত তাজা লাশ তুলে স্বামীবাগ ফেলেছি। পাক পশুরা যোগেশ বাবুর সর্বস্ব লুণ্ঠন করে তাকে তার নিজস্ব কামরায় বক্ষে বেয়নেট ঢুকিয়ে দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে রেখে যায়। পরে তার পবিত্র ক্ষত-বিক্ষত লাশ নিচে নামিয়ে এনে খাটের উপর রেখে দিয়েছিল। আমরা গিয়ে দেখলাম প্রফেসর যোগেশ বাবুর লাশ জীভ বের করে হা করে আছে। গায়ে ছিল ধুতি আর গেঞ্জি।



স্বাক্ষর/-

মোঃ সাহেব আলী।

১৯-০৫ ৭৪



।। ১০ ।।

মোঃ সাহেহুজ্জামান

সাব ইন্সপেক্টর অব পুলিশ

রমনা থানা, ঢাকা।



১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ সন্ধ্যায় আমি এক প্লাটুন ফোর্সসহ মিরপুর এক নম্বর সেকশনে টহলে ছিলাম। সন্ধ্যার পর পরই আমি মিরপুরের সর্বত্র থমথমে ভাব লক্ষ করেছি। রাত আনুমানিক সাড়ে দশটার সময় আমার ওয়্যারলেস সেটটি অকস্মাৎ সক্রিয় হয়ে উঠে। ওয়্যারলেস সেটে এক বাঙ্গালী পুলিশ কণ্ঠ অজানা ষ্টেশন থেকে বলছিল, “ঢাকা সেনানিবাস থেকে ট্যাঙ্ক ও কামানবাহী সশস্ত্র পাক সেনাদের ট্রাক সারিবদ্ধভাবে রাজধানীতে সদর্পে প্রবেশ করছে, বাঙ্গালী পুলিশ তোমরা সাবধান হও।” ইহার পর আমার ওয়্যারলেস সেটের মারফত ঢাকা পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে মেসেজ দেয়া হয়, “পুলিশ ডিউটি উইথড্রন।” ওয়্যারলেস মারফত এসব মেসেজ আসার পরপরই আমি ঢাকা রাজধানীর আকাশে সর্বত্র আগুনের ফুলকি উঠতে দেখলাম। অকস্মাৎ রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ইকবাল হল, ই,পি,আর হেডকোয়ার্টারে ভীষণ কামান ও ট্যাঙ্ক হামলার আকাশফাটা শব্দ শুনতে পাই। এ পরিস্থিতিতে আমি আমার টহলরত পুলিশ ফোর্সকে মিরপুরের পশ্চিম দিকে গ্রামের দিকে চলে গিয়ে প্রাণপণ প্রতিরোধ করার নির্দেশ দিয়ে আমি আমার রাইফেল ও গুলি নিয়ে থানার বাসায় চলে যাই। থানায় ফিরে আমি তৎকালীন মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার মিঃ আবুল হাসেম ও অন্যান্য সাব ইন্সপেক্টর, এ,এস,আই ও বাঙ্গালী পুলিশদের আমিন অত্যান্ত বিমর্ষ অবস্থায় দেখতে পাই। থানায় বসে আমরা ওয়্যারলেসে বাঙ্গালী কন্ঠের বহু বীভৎস আর্তনাদ শুনতে পাই।



রাত সাড়ে চারটার দিকে পাক পশুরা পুলিশ কন্ট্রোল রুম দখল করে সেখানকার ওয়্যারলেসে বাইরে টহলে নিযুক্ত বাঙ্গালী পুলিশদের কর্কশ কণ্ঠে বলছিল “ বাঙ্গালী শালালোগ আভী আ-কার দেখো, তোমারা কেতনা মা বাহেন হামারা পাস হ্যায়…”। এ কথা শুনে বাঙ্গালী পুলিশদের গা শিউরে উঠে। আমি তৎক্ষণাৎ ওয়্যারলেস সেট বন্ধ করে দেই। সকাল হওয়ার পূর্বেই আমি থানা ও থানার বাসা ছেড়ে দিয়ে মিরপুরে অন্য এক বাসায় আত্মগোপন করে থাকি।



সকালে আমি দেখলাম বাঙ্গালী ই,পি,আরদের মিরপুর ই,পি,আর ক্যাম্প থেকে বন্দী করে আমাদের থানার সম্মুখে এনে পাক-পশুরা নিরস্ত্র করে থানা বন্দী করছে। আমি আরো দেখলাম মিরপুরের সকল বাঙ্গালী বাড়ীতে বিহারীরা কপালে সাদা কাপড় বেঁধে দানবের মত উল্লাসে ফেটেপড়ে আগুন লাগাচ্ছে, লুটপাট করছে। বাড়ী বাড়ী থেকে বাঙ্গালী শিশু, যুবতী, বৃদ্ধাদের টেনে এনে রাস্তায় ফেলে ছোরা দিয়ে জবাই করছে, বাঙ্গালী রমণীদের ধরে এনে রাস্তায় উলঙ্গ করে ফেলে উপর্যুপরি ধর্ষণ করে তৎক্ষণাৎ ধারালো ছুরি দিয়ে স্তন ও পাছার মাংস ছলাৎ করে কেটে ফেলে নৃশংসভাবে হত্যা করছে। কাউকে কুচি কুচি করে কেটে ফেলছে, কারো যোনীতে লোহার রড ঢুকিয়ে দিচ্ছে, কারো গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে। ভীত সন্ত্রস্থ হাজারো মানুষ তখন প্রাণভয়ে গ্রামের দিকে পালিয়ে যাচ্ছিল। যে সকল নিরীহ মানুষ পালাতে পারছিলো না, তাদেরকে বিহারীরা নির্মমভাবে জবাই করেছিল। পাক সেনারা এ ব্যাপক বাঙ্গালী হত্যায় বিহারীদের পিছনে থেকে সাহায্য করছিল।



২৭শে মার্চ কিছুক্ষণের জন্য কার্ফূ তুলে নিলে আমি আমার পরিবার পরিজন নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে মিরপুরের বাইরে যাত্রা করি। মিরপুর গরুর হাট অতিক্রম করার সময় আমি দেখলাম পাক সেনাদের টহল ভেদ করে একটি ট্রাকে মহিলা ও শিশু মিরপুর ব্রীজের দিকে যাচ্ছিল- পাক সেনারা ঐ ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেয়। আর দুটি যুবতী মেয়েকে তাদের জীপে উঠিয়ে নিয়ে যায়। মেয়ে দুটি পাক পশুদের হাতে পড়ে প্রাণফাটা আর্তনাদ করছিল। আমরা দূর থেকে গরুর হাট বরাবর বোরো ধানের ক্ষেতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। বহু দুর্দশা ও লাঞ্চনা ভোগ করে আমি আট দিন পায়ে হেঁটে ও নৌকা যোগে দেশের বাড়ীতে পৌছি।



স্বাক্ষর/-

মোঃ সালেহুজ্জামান

৭/২/৭৪



।। ১১ ।।

রঞ্জিত (লাল বাহাদুর) ডোম

সুইপার কলোনী,

নারিন্দা শাহ সাহেব লেন,

থানা- সুত্রাপুর, ঢাকা।



১৯৭১ সনের ২৬ শে মার্চ সকাল ১০ টার সময় ঢাকা পৌরসভার হেল্‌থ অফিসার আনোয়ার সাহেব ঢাকা পিলখানার চোদ্দটুলী সুইপার কলোনী থেকে আমাদের সুইপার ইন্সপেক্টর পাঞ্জা ডোম সবুজজী, দরবারী, মহাবীর ও মুসু ডোমকে নিয়ে আমাদের এই সুইপার কলোনীর দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথের সম্মুখে দাঁড়িয়ে “গণেশ, লাল, বদনেস, রণজিৎ, কানাই” বলে চিৎকার করে ডাকতে থাকলে আমরা সবাই যার যার ঘর থেকে বের হয়ে দেখতে পেলাম ঢাকা পৌরসভার একটি জীপে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির তৎকালীন চেয়ারম্যান মিঃ সালামত আলী খান শুর, প্রশাসনিক অধিকর্তা মিঃ ইদ্রিস চিৎকার বলছেন, ঢাকার রাজপথে, বিভিন্ন জায়গায় বহু লাশ পড়ে আছে, তোমরা বের হয়ে আস, সে সব লাশ অবিলম্বে তুলে ধলপুর ময়লার ডিপোতে ফেলে দাও।



আমি, পরদেশি, গণেশ, চুন্নু আমরা সবাই মিটফোর্ড লাশ ঘর থেকে ২৮শে মার্চ সকালে দু’ট্রাক লাশ তুলে ধলপুর ময়লার ডিপোতে ফেলেছি। অধিকাংশ লাশ পচে, ফুলে বিকৃত ও বীভৎস হয়ে গিয়েছিল।



২৯শে মার্চ আমরা প্রথম মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে দু’ট্রাক লাশ তুলেছি। এরপর আমাদের দুই দিনের ছুটি দেয়া হয়।



তিনদিন পর আমরা রমনা কালীবাড়ী থেকে পাঁচটি পচা লাশ তুলে ট্রাকে কার্জন হলের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে পাক সেনারা আমাদের ট্রাক আটক করে আমাদের ট্রাক ড্রাইভার চান মিয়া ও সুইপার ইন্সপেক্টর পঞ্চমকে ধরে মারধোর করে। সুপারভাইজারকে চপেটাঘাত করে রাস্তায় ফেলে দিয়ে কুকুরের মত চিৎকার করে বলতে থাকে “লাশ খোলা কিউ লে যাতা হ্যায়, শুয়োর কা বাচ্ছা, বাহেনচোত, শালা হারামী, শালা তেরপল লাগা লো”। পরের দিন আমি, ছাখিল, পরদেশি, চুন্নু সবাই মিলে শাঁখারী বাজারে কোর্টের প্রবেশ পথে অগ্রসর হতে চাইলে আমাদের সেখানে জ্বলন্ত আগুনের অদুরে প্রহরারত পাক সেনারা বাবুবাজার ফাঁড়ি দিয়ে শাঁখারী বাজার প্রবেশ করতে বলে কর্কশভাবে। এ সময়ে আমরা দেখলাম সারা শাঁখারীবাজারে লেলিহান আগুনের শিখা জ্বলছে, সারা শাঁখারীবাজার জ্বলছে, জ্বলছে দালানকোঠা, ঘরবাড়ী, মুল্যবান আসবাবপত্র জ্বলছে। আমরা ট্রাক নিয়ে মন্দিরের ভেতর দুজন যুবকের পচাগলা লাশ তুলেছি। লাশ পচে পোক হয়ে গিয়েছিল। গলিত লাশ দেখে আমরা ভীত হয়ে পড়েছিলাম। কোন লোকজন ছিলনা, চারিদিক নিরব নিস্তব্ধ, শ্মশানের হাহাকার দেখলাম। প্রতিটি ঘর থেকে আমরা শিশু-কিশোর, বৃদ্ধা-যুবা, যুবক-যুবতীর পচা ও গলিত লাশ তুলেছি। আমাদের সাথে আরো দুই দল ডোম ঢাকা পৌরসভার দু’টি ট্রাকে লাশ তুলে ধলপুর ময়লার ডিপোতে ফেলেছে। এরপর আমরা সদরঘাট বুড়ীগঙ্গা পাড়, শ্যামবাজার ঘাট, বাদামতলী ঘাট থেকে লাশ তুলেছি। আমরা নদীর ঘাট থেকে যে সকল পচা, ফুলা, গলিত লাশ তুলেছি তার অধিকাংশ ছিল চোখ ও হাত-পা বাঁধা যুবকের লাশ। এরপর লাল কুঠীর ভেতর থেকে লুঙ্গী পরা দু’জন যুবকের পচা ও গলিত লাশ পেয়েছি, বাংলাবাজার, প্যারীদাস রোডের কয়েকটি বাড়ী থেকে আমরা লাশ তুলেছি। এরপর আমরা বনগ্রাম এলাকার রাস্তা থেকে কয়েকটি পচা লাশ তুলেছি। কমলাপুর থেকে আমরা ট্রেন যাত্রীদের লাশ তুলেছি, আমরা মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা থেকে শ্রমিকদের বহু লাশ তুলেছি।



টিপসহি

রঞ্জিত

৮-৫-৭৪


।। ১২ ।।
বদলু ডোম
ওয়ারী সুইপার কলোনী,
ঢাকা।



আমি ১৯৭১ সনের ২৮শে মার্চ আমাদের সুইপার সুপারভাইজার পঞ্চমের দলে মিটফোর্ড হাসপাতালের লাশ ঘর থেকে লাশ তুলেছি। কয়েকদিন পরে আমি সুপারভাইজার সাহেব আলীর দলে মিলব্যারাক পুলিশ লাইনের নদীর পাড় থেকে পনের জন যুবক, একজন সাধু ও বৃদ্ধার ক্ষতবিক্ষত, ফুলা, পচা লাশ তুলেছি। প্রতিটি লাশ চোখ ও হাত-পা বাঁধা ছিল। এরপর আমরা বাবুবাজার পুলের উপর থেকে এক অন্ধ ফকিরের লাশ তুলেছি। সদরঘাট, শ্যামবাজার, ওয়াজঘাট, বাদামতলী এলাকায় আমরা নদীর পাড় ও পানি থেকে বৃদ্ধা, যুবা ও শিশুর লাশ তুলেছি। কয়েকদিন পর আমরা মন্দিরের সামনে থেকে দুধওয়ালা সাধুর লাশ তুলেছি, শাঁখারীবাজার প্রবেশ করে মন্দিরের সামনের বাড়ীর ভেতর থেকে শিশু-কিশোর, বৃদ্ধা-যুবা, যুবক-যুবতীর দশটি পোকায় খাওয়া গলিত লাশ নিয়ে এসেছি।

কয়েকদিন পর রমনা কালিবাড়ী থেকে, মন্দিরের ভেতর থেকে পাঁচটি এবং কালিবাড়ীর প্রবেশ পথে দুটি চোখ ও হাত বাঁধা পচা লাশ তুলেছি। গোয়ালঘরে তিনটি গরু গুলিতে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলাম। এরপর পাক সেনারা আমাদের নির্মমভাবে মারপিট করায় আমরা আর লাশ তুলতে যাই নাই।



স্বাক্ষর/-

বদলু ডোম

১১-৫-৭৪


।। ১৩ ।।
চুন্নু ডোম,
ঢাকা পৌরসভা,
রেলওয়ে সুইপার কলোনী,
২২৩ নং ব্লক, ৩নং রেল গেট
ফুলবাড়িয়া, ঢাকা।



১৯৭১ সনের ২৮শে মার্চ আমাদের সুইপার ইন্সপেক্টর ইদ্রিস সাহেব আমাকে লাশ উঠাবার জন্য ডেকে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটিতে নিয়ে যান। সেখান থেকে আমাকে বদলু ডোম, রঞ্জিত লাল বাহাদুর, গণেশ ডোম ও কানাইকে একটি ট্রাকে করে প্রথমে শাঁখারীবাজারে কোর্টের প্রবেশ পথের সম্মুখে নামিয়ে দেয়। আমরা উক্ত পাঁচ জন দেখলাম ঢাকা জজ কোর্টের দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথের যে রাজপথ শাঁখারীবাজারের দিকে চলে গেছে, সে রাস্তার দু’ধারে ড্রেনের পাশে যুবক-যুবতীর, নারী-পুরুষের, শিশু-কিশোরের বহু পচা লাশ। দেখতে পেলাম বহু লাশ পচে ফুলে বীভৎস হয়ে আছে, দেখলাম শাখারীবাজারের দুদিকের ঘরবাড়ীতে আগুন জ্বলছে, অনেক লোকের অর্ধপোড়া লাশ পড়ে থাকতে দেখলাম, দুই পার্শ্বে অদূরে সশস্ত্র পাঞ্জাবী সেন্যদের প্রহরায় মোতায়েন দেখলাম। প্রতিটি ঘরে দেখালাম মানুষ ও আসবাবপত্র জ্বলছে। একটি ঘরে প্রবেশ করে এক জন মেয়ে, এক জন শিশু সহ ১২ জন যুবকের দগ্ধ লাশ উঠিয়েছি। শাঁখারীবাজারের প্রতিটি ঘর থেকে যুবক-যুবতী, বালক-বালিকা, কিশোর-শিশু ও বৃদ্ধের লাশ তুলেছি। পাঞ্জাবীরা প্রহরায় থাকাকালে সেই সব মানুষের অসংখ্য লাশের উপর বিহারীদের উচ্ছৃঙ্খল উল্লাসে ফেটে পড়ে লুট করতে দেখলাম। প্রতিটি ঘর থেকে বিহারী জনতাকে মূল্যবান সামগ্রী, দরজা, জানালা, সোনাদান সবকিছু লুটে নিয়ে যেতে দেখলাম। লাশ উঠাতে উঠাতে এক ঘরে প্রবেশ করে এক অসহায় বৃদ্ধাকে দেখলাম- বৃদ্ধা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে “পানি পানি” বলে চিৎকার করছিল, তাকে আমি পানি দিতে পারি নাই ভয়ে, বৃদ্ধাকে দেখে আমি আরো ভীত হয়ে পালিয়ে এসেছি। আমি পানি দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের পিছনে সশস্ত্র পাঞ্জাবী সেনা প্রহরায় থাকায় আমি সেই বৃদ্ধাকে পানি দিয়ে সাহায্য করতে পারি নাই।



আমরা ১৯৭১ সনের ২৮শে মার্চ শাঁখারিবাজার থেকে প্রতিবারে একশত লাশ উঠিয়ে তৃতীয়বার ট্রাকে বোঝাই করে তিনশত লাশ ধলপুর ময়লার ডিপোতে ফেলেছি।



১৯৭১ সনের ২৯শে মার্চ সকাল থেকে আমরা মিটফোর্ড হাসপাতালের লাশঘর ও প্রবেশপথের দুপার্শ্ব থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিববাড়ী, রমনা কালিবাড়ী, রোকেয়া হল, মুসলিম হল, ঢাকা হল থেকে লাশ উঠিয়েছি। ২৯শে মার্চ আমাদের ট্রাক প্রথম ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালের প্রবেশ পথে যায়। আমরা উক্ত পাঁচজন ডোম হাসপাতালের প্রবেশপথে নেমে একটি বাঙ্গালী যুবকের পচা, ফুলা, বিকৃত লাশ দেখতে পেলাম। লাশ গলে যাওয়ায় লোহার কাঁটার সাথে গেঁথে লাশ ট্রাকে তুলেছি। আমাদের ইন্সপেক্টর আমাদের সাথে ছিলেন। এরপর আমরা লাশ ঘরে প্রবেশ করে বহু যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-কিশোর ও শিশুর স্তুপীকৃত লাশ দেখলাম। আমি এবং বদলু ডোম লাশ ঘর থেকে লাশের পা ধরে টেনে ট্রাকের সামনে জমা করেছি, আর গণেশ, রঞ্জিত(লাল বাহাদুর) এবং কানাই লোহার কাঁটা দিয়ে বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে পচা, গলিত লাশ ট্রাকে তুলেছে। প্রতিটি লাশ গুলিতে ঝাঁঝরা দেখিছি, মেয়েদের লাশের কারো স্তন পাই নাই, যোনীপথ ক্ষতবিক্ষত এবং পিছনের মাংস কাটা দেখিছি। মেয়েদের লাশ দেখে মনে হয়েছে, তাদের হত্যা করার পূর্বে তাদের স্তন জোর করে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, যোনিপথে লোহার রড কিংবা বন্দুকের নল ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। যুবতী মেয়েদের যোনিপথের এবং পিছনের মাংস যেন ধারালো চাকু দিয়ে কেটে এসিড দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রতিটি যুবতী মেয়ের মাথায় খোঁপা খোঁপা চুল দেখলাম। মিটফোর্ড থেকে আমরা প্রতিবারে একশত লাশ নিয়ে ধলপুর ময়লার ডিপোতে ফেলেছি।



১৯৭১ সনের ৩০শে মার্চ আমাদের উক্ত পাঁচ জনের সাথে দক্ষিণা ডোমকে সাহায্য করতে দেয়া হয়। আমাদের ট্রাক সেদিন সাত মসজিদের সম্মুখ থেকে যখন বাঙ্গালী লাশ উঠাচ্ছিলাম, তখন অসংখ্য বিহারী জনতা আমাদের চারিদিকে দাঁড়িয়ে হাসছিল, বাঙ্গালীদের পরিণতি দেখে উপহাস করছিল। আমরা সাত মসজিদের সম্মুখ থেকে আটটি বাঙ্গালী যুবকের লাশ তুলেছি, কতিপয় লাশ দেখলাম উপুড় হয়ে পড়ে আছে। সবার পিঠ গুলির অসংখ্য আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে আছে। পচা, ফুলা লাশ তুলতে যেয়ে দেখলাম কারো লুঙ্গী পরা, কারো পায়জামা পরা। আবার কারো দেহে হাওয়াই শার্ট এবং টেট্রনের দামী শার্ট। পানি থেকে বারটি লাশ তুলেছি; প্রতিটি লাশের চোখ এবং হাত পেছনের দিকে বাঁধা ছিল। নদীর পাড় থেকে বারটি লাশ গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা দেখেছি। লাশ দেখে মনে হল, ভদ্র ঘরের অভিজাত বাঙ্গালী যুবকের লাশ। সাত মসজিদের সকল লাশ তুলে আমরা ধলপুর ময়লা ডিপোতে ফেলেছি। ফিরে এসে ট্রাক নিয়ে আমরা মিন্টু রোডের লাশ তুলতে গিয়েছি। মিন্টু রোডের রাস্তার পাশ থেকে প্যান্ট পরা দুটি পচা, ফুলা লাশ তুলেছি, দেখলাম লাশের পাশেই ভিক্ষার ঝুলি, টিনের ডিব্বা ও লাঠি পড়ে আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিববাড়ীর সম্মুখ থেকে দুজন রুপসী যুবতী মেয়ে এবং তিন জন যুবকের ক্ষতবিক্ষত লাশ তুলেছি। রোকেয়া হলে একটি অর্ধদগ্ধ যুবতীর লাশ তুলেছি, মুসলিম হলে প্রবেশ করে একটি পচা লাশ পেয়েছি, ঢাকা হলের ভেতর থেকে চারজন ছাত্রের লাশ তুলেছি।



পরের দিন ৩১ মার্চ বাসাবো খাল থেকে তিনটি পচা লাশ তুলেছি। সেদিন অসুস্থ্ থাকায় আমি আর লাশ তুলতে যেতে পারি নাই।



টিপসহি/-

চুন্নু ডোম

৭-৪-৭৪

।। ১৪ ।।
ছোটন ডোম
রেলওয়ে সুইপার কলোনী
২২৩নং ব্লক, ৩নং রেল গেট
ফুলবাড়িয়া, ঢাকা।



১৯৭১ সনের ২৮শে মার্চ সকাল ৮টায় ঢাকা পৌরসভার সুইপার সুপারভাইজার পঞ্চম আমাদের নিতে আসেন। পাক সেনারা রাজধানী ঢাকার বহু লোককে নির্বিচারে হত্যা করার ফলে বিভিন্ন এলাকায় যে সকল লাশ পচে ফুলে রাস্তায় পড়ে আছে তা তুলে ধলপুর ময়লার ডিপোতে ফেলার জন্য রেলওয়ে কলোনী থেকে আমাকে ও দুখী লালকে ডেকে নিয়ে যায়। আমরা ঢাকা পৌরসভায় গিয়ে সেখানে আমার ভাতিজা ডোম গাংওয়া, আমার মেয়ে জামাই হরি ডোম, সন্টু, ফেকু ডোম, দরবারী, গণেশ, লেমু, লাল বাহাদুর, খুবী, পরদেশী, অর্জুন সবাইকে হাজির দেখেছি। আমার দলে আমরা-আমি, দরবারী, মহেশ, কানহাই, হরি, ফেকওয়া এই ছয়জন ছিলাম। সুইপার সুপারভাইজার পঞ্চম আমাদের সাথে ছিলেন। আমাদের ট্রাক ইংলিশ রোডের মুখে রায়সাহেব বাজারের প্রবেশপথ দিয়ে গোয়ালনগরের স্কুল ও মন্দিরের সুম্মখে যেয়ে থামানো হয়। মন্দিরের ভেতর প্রবেশ করে হাফ শার্ট ও হাফ প্যান্ট পরা এক চৌদ্দ বছরের সুন্দর ফুটফুটে ছেলের সদ্য মৃত লাশ দেওয়ালে ঠেশ দিয়ে পড়ে থাকতে দেখলাম- ছেলেটিকে তাড়িয়ে দিয়ে পিছন দিক থেকে হাত বেঁধে মাথার পিছন দিক থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। মাথার পিছন দিক দিয়ে অঝোরে তাজা রক্ত ঝরতে দেখলাম- সদ্য মৃত তাজা লাশ, হাত দিয়ে বড় আদরের সাথে ট্রাকে তুলে দিলাম। কচি ছেলের তুলতুলে লাশ তুলতে গিয়ে আমার হৃদয় যেন কেঁপে উঠলো, হাহাকার করে উঠলো। হায়, না জানি কোন মায়ের আদরের দুলাল, চোখের মনিকে পশুরা তাড়িয়ে এনে এভাবে হত্যা করে গেছে। লাশের ডাগর ডাগর চোখের দিকে তাকাতেই আমার চোখ বেয়ে পানি ঝরতে লাগলো অঝোরে, আমি কিছুতেই আমার চোখের পানি আটকে রাখতে পারলাম না। পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে রাস্তার উপর আরো একটি যুবকের তাজা লাশ দেখলাম- উভয়ই মুসলমান যুবকের লাশ। গোয়ালনগরের দক্ষিণ দিকের রাস্তা দিয়ে আমরা অগ্রসর হয়ে দূর্গা মায়ের মন্দিরের নিকটবর্তী বাড়ীর অভ্যন্তরে রান্না ঘরে প্রবেশ করে সেখানে এক ঘরেই এগারটি পচা, ফুলা লাশ দেখলাম- তিনজন বাইরে- অবশিষ্টগুলি পালং- এর নিচে। একজন অর্ধ বয়সের রুপসী মহিলা মাথায় কোমর পর্যন্ত লম্বা চুল, হরিণের মত মায়াময় মুখ, লাবণ্যময় দেহ, সারা দেহের উপর যেন ভগবান দুধের সর বিছিয়ে দিয়েছিলেন। প্রবেশপথে দুটি যুবক ও একজন কিশোরের লাশ দেখলাম- ঘরের ভেতরে পালং এর নিচে থেকে আরো ছয়জন যুবক ছেলের লাশ তুলে আনলাম। পাশের ঘরে প্রবেশ করে দু’জন যুবক ছেলে ও একজন মধ্যবয়সী লোকের পচা লাশ তুলেছি। উপরোক্ত সমস্ত লাশ নিয়ে আমি ধলপুর ময়লার ডিপোতে গিয়ে দেখলাম- বড় বড় গর্ত করে কুলিরা বসে আছে- ট্রাক থামিয়ে আমরা সব লাশ গর্তে ঢেলে দিলে কুলিরা মাটি ফেলে গর্ত বন্ধ করে দিল। লাশ উঠাবার জন্য আমাদের প্রত্যেককে তিন টাকা করে দিলে আমি সারাদিন না খেয়ে লাশ তুলতে অস্বীকার করে চলে আসি। সারাদিন লাশ তুলে আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। পরের দিন থেকে আমি আর লাশ তুলতে যাই নাই।



টিপসহি

ছোটন ডোম

৭-৪-৭৪


।। ১৫ ।।
পঞ্চম
সুইপার সুপারভাইজার
সুইপার কলোনী, গণকটুলী
নওয়াবগঞ্জ, ঢাকা।



আমি ১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ কালরাতে গণকটুলী পৌরসভার সুইপার কলোনীতে ছিলাম। এখানে আমাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা আমার সাথে অবস্থান করছিল। সেই দিন রাত থেকে আমাদের কলোনীর চারিদিকে সান্ধ্য আইন জারি করে বর্বর পাক সেনারা ই,পি,আর হেডকোয়ার্টারে বাঙ্গালী জোয়ানদের নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে। আমরা কলোনীতে সকল সুইপার দরজা-জানালা বন্ধ করে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলাম। বাইরে চলছিল চারিদিকে বৃষ্টির মত গোলাবর্ষণ।



২৭শে মার্চ সকাল নয়টায় সান্ধ্য আইন কিছুক্ষণের জন্য উঠিয়ে নিলে সবাই স্বপরিবারে ঢাকার বাংলাদেশ মাঠ (পাকিস্তান মাঠ-আগা সাদেক রোড) সংলগ্ন সুইপার বস্তিতে আশ্রয় গ্রহন করি। গণকটুলির আমাদের সুইপার কলোনীর একজন পুরুষ সুইপার মুখ ধোয়ার সময় এবং কাউসিলা দেবী নামে একজন হিন্দু সুইপারকে পাক সেনারা গুলি করে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। “পৌরসভার সকল কর্মচারী অবিলম্বে কাজে যোগদান করতে হবে” – রেডিও মারফত আমি এই ঘোষনা শুনে চাকুরীর স্বার্থে পৌরসভায় এসে রিপোর্ট করি। অফিসে এসে দেখলাম, পৌরসভার তৎকালীন কনসারভেন্সি অফিসার ইদ্রিস সাহেব ক্রোধান্ধ হয়ে ডোমদের ডাকছেন। তার নির্দেশে আমি, সুইপার ইন্সপেক্টর রামদীন, ডোম পরদেশী, গণেশ, লেমু এবং লাল বাহাদুর- আমরা সবাই প্রথমে ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালে লাশ তুলতে যাই। আমরা সেদিন মিটফোর্ড থেকে দু’ট্রাক লাশ তুলেছি- সকল লাশ আমরা ওয়ারী আউটকলে ফেলেছি। সেখানেই পূর্বেই শ্রমিকদের দ্বারা বিরাট বিরাট লম্বা লম্বা গর্ত করে রাখা হয়েছিল। আমরা লাশ নিয়ে সেই সব গর্তে ফেলেছি।



পরের দিন আমার দল আবার মিটফোর্ডে লাশ তুলতে যাই।



আমরা ২৯ শে মার্চ মিটফোর্ড লাশ ঘর থেকে দু’ট্রাক লাশ তুলেছি। পরদেশী এবং তার ভাই চুন্নু নীচে দাঁড়িয়ে পচা, ফুলা গুলিতে ক্ষতবিক্ষত লাশ তুলে ট্রাকের সম্মুখে এনেছে- রঞ্জিত(লাল বাহাদুর) ও গণেশ দু’জন ট্রাকের উপরেই ছিল। অধিকাংশ লাশ খাকী শার্ট পরা- পুলিশের ছিল। আমরা সকল লাশ ওয়ারী আউটকলে ফেলেছি।



পরের দিন আমার দল বুড়িগঙ্গা নদীর পাড় ও শ্যামবাজার থেকে লাশ তুলেছে।



তিন দিন পর আমার দল রমনা কালিবাড়ী থেকে লাশ তুলেছে। ডোম রঞ্জিত, গণেশ ও বদলু ছয়টি গন্ধ পোড়া লাশ তুলেছে। বুড়ীগঙ্গা নদী থেকে আমার দল আমার উপস্থিতিতে যে সব বাঙ্গালী যুবকের লাশ তুলেছে তার প্রায় সবই চোখ, হাত-পা বাঁধা ছিল। আমার দল বেশ কয়েকদিন পরে ঢাকা হলের ভেতর থেকে তিন জন যুবকের পচা লাশ তুলেছে।



স্বাক্ষর/-

পঞ্চম

১১-৫-৪৪


।। ১৬ ।।
পরদেশি
সুইপার, সরকারী পশু হাসপাতাল
ঢাকা।



১৯৭১ সনের ২৭শে মার্চ সকালে রাজধানী ঢাকায় পাক সেনাদের বীভৎস হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকা পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান মেজর সালামত আলী খান শুরের প্রশাসনিক অফিসার মিঃ ইদ্রিস পৌরসভার আরো কয়েকজন অফিসার সঙ্গে নিয়ে একটি মিউনিসিপ্যাল ট্রাকে পশু হাসপাতালের গেটে এসে বাঘের মত “পরদেশী পরদেশী” বলে গর্জন করতে থাকলে আমি ভীত- সন্ত্রস্তভাবে আমার কোয়ার্টার থেকে বের হয়ে আসি। ইদ্রিস সাহেব অত্যান্ত ক্রুদ্ধভাবে কর্কশ স্বরে বলতে থাকেন “তোমরা সব সুইপার ডোম বের হও, যদি বাঁচতে চাও অবিলম্বে সবাই মিলে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় স্তুপীকৃত লাশ উঠিয়ে ধলপুর ডিপোতে ফেলে দাও। নইলে কাউকে বাঁচানো হবেনা, কেউ বাঁচতে পারবেনা”। পৌরসভার সেই ট্রাকে নিন্মবর্ণিত সুইপাররা বসা ছিলঃ

১। ভারত

২। লাডু

৩। কিষণ।



আমি তার নির্দেশ অমান্য করার কোন উপায় না দেখে ট্রাকে উঠে বসলাম। সেই ট্রাকে করে পৌরসভা অফিসে আমাদের প্রায় আঠারজন সুইপার ও ডোমকে একত্রিত করে প্রতি ছয়জনের সাথে দুইজন করে সুইপার ইন্সপেক্টর আমাদের সুপারভাইজার নিয়োজিত করে তিন ট্রাকে তিনদলকে বাংলাবাজার, মিটফোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রেরণ করা হয়। আমি মিটফোর্ডের ট্রাকে ছিলাম। সকাল নয়টার সময় আমাদের ট্রাক মিটফোর্ড হাসপাতালের সম্মুখে উপস্থিত হলে আমরা ট্রাক থেকে নেমে লাশ ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে বুকে ও পিঠে মেশিনগানের গুলিতে ঝাঁঝরা করা প্রায় একশত যুবক বাঙ্গালীর বীভৎস লাশ দেখালাম। আমি আমার সুপারভাইজারের নির্দেশে লাশ ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে প্রতিটি লাশের পায়ে ধরে টেনে বের করে বাইরে দাঁড়ানো অন্যান্য সুইপারের হাতে তুলে দিয়েছি ট্রাকে উঠাবার জন্য। আমি দেখেছি প্রতিটি লাশের বুক ও পিঠ মেশিনগানের গুলিতে ঝাঁঝরা। সব লাশ তুলে দিয়ে একপাশে একটা লম্বা টেবিলের উপর চাদর দিয়ে ঢেকে দেওয়া একটি লাশের উপর থেকে চাদর টেনে উঠিয়ে দেখলাম, একটি ষোড়শী যুবতীর উলঙ্গ লাশ- লাশের বক্ষ, যোনিপথ ক্ষতবিক্ষত, কোমরের পেছনের মাংশ কেটে তুলে নেয়া হয়েছে, বুকের স্তন থেতলে গেছে, কোমর পর্যন্ত লম্বা কালো চুল, হরিণের মত মায়াময় চোখ দেখে আমার চোখ বেয়ে পানি পড়তে থাকলো, আমি কিছুতেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। আমি আমার সুপারভাইজারের ভয়াল এবং ভয়ঙ্কর কর্কশ গর্জনের মুখে সেই সুন্দরীর পবিত্র দেহ অত্যান্ত যত্ন সম্ভ্রমের সাথে ট্রাকে উঠিয়ে দিলাম। মিটফোর্ড লাশ ঘরের সকল লাশ ট্রাকে উঠিয়ে আমরা ধলপুরের ময়লার ডিপোতে নিয়ে গিয়ে বিরাট গর্তের মধ্যে ঢেলে দিলাম। দেখলাম বিরাট গর্তের মধ্যে সুইপার ও ডোমরা রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে নিয়ে আসা লাশ ট্রাক থেকে গর্তের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। আমি অধিকাংশ লাশের দেহে কোন কাপড় দেখি নাই, যে সমস্ত যুবতী মেয়ে ও রমণীদের লাশ গর্তের মধ্যে ফেলে দেওয়া হল তার কোন লাশের দেহেই আমি কোন আবরণ দেখি নাই। তাদের পবিত্র দেহ দেখেছি ক্ষতবিক্ষত, তাদের যোনিপথ পিছন দিক সহ আঘাতে বীভৎস হয়ে আছে। দুপুর প্রায় দুইটার সময় আমরা রমনা কালিবাড়ীতে চলে আসি পৌরসভার ট্রাক নিয়ে। লাশ উঠাবার জন্য ট্রাক রমনা কালীবাড়ীর দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখে, দু’জনকে ট্রাকে দাঁড় করিয়ে রেখে আমরা চারজন কালিবাড়ীর ভেতরে গিয়ে দেখি সবকিছু পুড়ে ভস্ম হয়ে আছে। কালিবাড়ীর ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো ছিটানো ৪১টি পোড়া লাশ আমি ট্রাকে তুলেছি। কালিবাড়ীর এসকল লাশ আমরা ধলপুরের ময়লার ডিপোতে গর্তের মধ্যে ফেলেছি। লাশ তুলে তুলে মানুষের পচা চর্বির গন্ধে আমার পাজস্থলি বের হতে চাচ্ছিল।



পরের দিন আমি আর লাশ তুলতে যাই নাই, যেতে পারি নাই, সারাদিন ভাত খেতে পারি নাই, ঘৃণায় কোনকিছু স্পর্শ করতে পারি নাই।



পরের দিন ২৯শে মার্চ সকালে আমি আবার ঢাকা পৌরসভা অফিসে হাজির হলে আমাকে ট্রাক নিয়ে লাশ তোলার জন্য আরো কয়েকজন সুইপারের সাথে ঢাকা শাঁখারী বাজার যেতে বলা হয়। জজ কোর্টের সম্মুখে আগুনের লেলিহান শিখা তখনো জ্বলছিল, আর পাক সেনারা টহলে মোতায়েন ছিল বলে আমরা ট্রাক নিয়ে সে পথ দিয়ে শাঁখারীবাজার প্রবেশ করতে পারি নাই। পাটুয়াটুলী ঘুরে আমরা শাঁখারীবাজারের পশ্চিম দিকে প্রবেশ করে পাটুয়াটুলী ফাঁড়ি পার হয়ে আমাদের ট্রাক শাঁখারীবাজার প্রবেশ করল। ট্রাক থেকে নেমে আমরা শাঁখারীবাজারের প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করলাম- দেখলাম মানুষের লাশ নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, বালক-বালিকা, কিশোর-শিশুর বীভৎস পচা লাশ, চারিদিকে ইমারত সমূহ ভেঙ্গে পড়ে আছে, মেয়েদের অধিকাংশ লাশ আমি সম্পূর্ণ উলঙ্গ দেখলাম, দেখলাম তাদের বুক থেকে স্তন তুলে নেওয়া হয়েছে। কারো কারো যোনিপথে লাঠি ঢুকান হয়েছে। বহু পোড়া, ভস্ম লাশ দেখেছি। পাঞ্জাবী সেনারা পাষণ্ডের মত লাফাতে লাফাতে গুলিবর্ষণ করছিল, বিহারী জনতা শাঁখারীবাজারের প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করে মুল্যবান আসবাবপত্র, সোনাদান লুণ্ঠন করে নিয়ে যাচ্ছিল, আমরা অবিরাম গুলিবর্ষণের মুখে প্রাণের ভয়ে দুই ট্রাক লাশ তুলে লাশ তোলার জন্য সেদিন আর শাঁখারীবাজারে প্রবেশ করার সাহস পাই নাই।



৩০শে মার্চ সকালে আমার দলকে মিলব্যারাক থেকে লাশ তুলতে বলা হয়। আমি মিলব্যারাক ঘাটে পৌরসভার ট্রাক নিয়ে গিয়ে দেখলাম নদীর ঘাটে অসংখ্য মানুষের লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, বহু লাশ রশি দিয়ে বাঁধা দেখলাম, প্রতিটি রশির বন্ধন খুলে প্রতি দলে দশ জন পনের জনের লাশ বের করলাম, সব যুবক ছেলে ও স্বাস্থ্যবান বালকদের লাশ দেখলাম। প্রতিটি লাশের চোখ বাঁধা, হাত বাঁধা, শক্ত করে পিছন দিক থেকে। প্রতিটি লাশের মুখমণ্ডল কালো দেখলাম, এসিডে জ্বলে বিকৃত ও বিকট হয়ে আছে। লাশের সামনে গিয়ে ঔষধের অসহ্য গন্ধ পেলাম। লাশের কোন দলকে দেখালাম মেশিনগানের গুলিতে বুক ও পিঠ ঝাঁঝরা হয়ে আছে, অনেক লাশ দেখলাম বেয়নেটের আঘাতে বীভৎস হয়ে আছে, কারো মাথা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে মগজ বের হয়ে আছে, কারো কাটা হৃদপিন্ড বের হয়ে আছে। নদীর পাড়ে ছয়জন রুপসী যুবতীর বীভৎস ক্ষতবিক্ষত, উলঙ্গ লাশ দেখলাম। চোখ বাঁধা, হাত-পা শক্ত করে বাঁধা প্রতিটি লাশ গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা, মুখমন্ডল, বক্ষ ও যোনিপথ রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত ও বীভৎস দেখলাম। দুইবারে দুই ট্রাকে আমি সত্তরটি লাশ উঠিয়ে আমি ধলপুর ময়লার ডিপোতে ফেলেছি। এরপর আমাকে সদরঘাট, শ্যামবাজার, বাদামতলী ঘাট থেকে লাশ তুলতে বলা হয়। আমি উপরোক্ত এলাকার ঘাট থেকে পচা লাশ তুলে ধলপুর ময়লা ডিপোতে ফেলেছি। আমি যেদিন কালিবাড়ীতে লাশ তুলেছি, সেদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের পিছনে ষ্টাফ কোয়ার্টার, রোকেয়া হলের পশ্চিম দিকে জনৈক অধ্যাপকের বাসা থেকে লাশ তুলেছি। রোকেয়া হলের পিছনের ষ্টাফ কোয়ার্টারের ভেতর থেকে আমি মেয়ে, পুরুষ ও শিশু সমেত নয়টি লাশ তুলেছি। আর অধ্যাপকের বাসা থেকে সিঁড়ির সামনে লেপের ভেতর পেঁচানো জনৈক অধ্যাপকের লাশ আমি তুলে নিয়ে গেছি।



স্বাক্ষর/-

পরদেশী

২১-৩-৭৪



।। ১৭ ।।

মিসেস রাবেয়া খাতুন,

সুইপার, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা।



১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ রাতে হানাদার পাঞ্জাবী সেনারা যখন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের উপর অতর্কিতে হামলা চালায় তখন আমি রাজারবাগ পুলিশ লাইনের এস, এফ ক্যান্টিনে ছিলাম। আসন্ন হামলার ভয়ে আমি সারাদিন পুলিশ লাইনের ব্যারাক ঝাড়ু দিয়ে রাতে ব্যারাকেই ছিলাম। কামান, গোলা, লাইটবোম আর ট্যাঙ্কের অবিরাম কানফাটা গর্জনে আমি ভয়ে ব্যারাকের মধ্যে কাত হয়ে পড়ে থেকে থরথরিয়ে কাঁপছিলাম।



২৬ শে মার্চ সকালে ওদের কামানের সম্মুখে আমাদের বীর বাঙ্গালী পুলিশ বাহিনী বীরের মত প্রতিরোধ করতে করতে আর টিকে থাকতে পারে নাই। সকালে ওরা পুলিশ লাইনের এস, এফ ব্যারাকের চারিদিকে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং ব্যারাকের মধ্যে প্রবেশ করে বাঙ্গালী পুলিশদের নাকে, মুখে, সারা দেহে বেয়নেট ও বেটন চার্জ করতে ও বুটের লাথি মারতে মারতে বের করে নিয়ে আসছিল। ক্যান্টিনের কামরা থেকে বন্দুকের নলের মুখে আমাকেও বের করে আনা হয়, আমাকে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয় এবং আমার উপর প্রকাশ্যে পাশবিক অত্যাচার করছিল আর কুকুরের মত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিল। আমার উপর পাশবিক অত্যাচার করতে করতে যখন আমাকে একেবারে মেরে ফেলে দেওয়ার উপক্রম হয়, তখন আমার বাঁচবার আর কোন উপায় না দেখে আমি আমার প্রাণ বাঁচাবার জন্য ওদের নিকট কাতর মিনতি জানাচ্ছিলাম। আমি হাউমাউ করে কাঁদছিলাম, আর বলছিলাম আমাকে মেরোনা, আমি সুইপার, আমাকে মেরে ফেললে তোমাদের পায়খানা ও নর্দমা পরিস্কার করার আর কেউ থাকবেনা, তোমাদের পায়ে পড়ি তোমরা আমাকে মেরোনা, মেরো না, মেরো না, আমাকে মেরে ফেললে তোমাদের পুলিশ লাইন রক্ত ও লাশের পচা গন্ধে মানুষের বাস করার অযোগ্য হয়ে পড়বে। তখনো আমার উপর এক পাঞ্জাবী কুকুর, কুকুরের মতই আমার কোমরের উপর চড়াও হয়ে আমাকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করছিল। আমাকে এভাবে ধর্ষণ করতে করতে মেরে ফেলে দিলে রাজারবাগ পুলিশ লাইন পরিস্কার জন্য আর কেউ থাকবে না একথা ভেবে ওরা আমাকে ছেড়ে দিয়ে আমাকে এক পাঞ্জাবী ধমক দিয়ে বলতে থাকে, “ঠিক হায়, তুমকো ছোড দিয়া যায়েগা জারা বাদ, তোম বাহার নাহি নেকলে গা, হারওয়াক্ত লাই পার হাজির রাহেগা।“ একথা বলে আমাকে ছেড়ে দেয়।



পাঞ্জাবী সেনারা রাজাকার ও দালালদের সাহায্যে রাজধানীর স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং অভিজাত জনপদ থেকে বহু বাঙ্গালী যুবতী মেয়ে, রুপসী মহিলা এবং সুন্দরী বালিকাদের জীপে, মিলিটারী ট্রাকে করে পুলিশ লাইনের বিভিন্ন ব্যারাকে জমায়েত করতে থাকে। আমি ক্যান্টিনের ড্রেন পরিস্কার করছিলাম, দেখলাম আমার সম্মুখ দিয়ে জীপ থেকে আর্মী ট্রাক থেকে লাইন ধরে বহু বালিকা যুবতী ও মহিলাকে এস, এফ ক্যান্টিনের মধ্য দিয়ে ব্যারাকে রাখা হল। বহু মেয়েকে হেডকোয়ার্টার বিল্ডিনহ- এ উপর তালায় রুমে নিয়ে যাওয়া হল, আর অবশিষ্ট মেয়ে যাদেরকে ব্যারাকের ভেতর জায়গা দেয়া গেল না তাদের বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রাখা হল। অধিকাংশ মেয়ের হাতে বই আর খাতা দেখলাম, অনেক রুপসী মেয়ের দেহে অলঙ্কার দেখলাম, তাদের মধ্যে অধিকাংশ মেয়ের চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু পড়ছিল। এরপরই আরম্ভ হয়ে গেল বাঙ্গালী নারীদের উপর বীভৎস ধর্ষণ। লাইন থেকে পাঞ্জাবী সেনারা কুকুরের মত জীভ চাটতে চাটতে ব্যারাকের মধ্যে উন্মত্ত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে প্রবেশ করতে লাগলো। ওরা ব্যারাকে ব্যারাকে প্রবেশ করে প্রতিটি যুবতী, মহিলা, ও বালিকার পরনের কাপড় খুলে একেবারে উলঙ্গ করে মাটিতে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে বীভৎস ধর্ষণে লাগে গেল। কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই নিরীহ বালিকাদের উপর ধর্ষণে লেগে গেল, আমি ব্যারাকে ড্রেন পরিস্কার করার অভিনয় করছিলাম আর ওদের বীভৎস পৈশাচিকতা দেখছিলাম। ওদের উন্মত্ত উল্লাসের সামনে কোন মেয়ে কোন শব্দ পর্যন্ত করে নাই, করতে পারে নাই। উন্মত্ত পাঞ্জাবী সেনারা এই নিরীহ বাঙ্গালী মেয়ে শুধুমাত্র ধর্ষণ করেই ছেড়ে দেয় নাই- আমি দেখলাম পাক সেনারা সেই মেয়েদের উপর পাগলের মতো উঠে ধর্ষণ করছে আর ধারালো দাঁত বের করে বক্ষের স্তন ও গালের মাংস কামড়াতে কামড়াতে রক্তাক্ত করে দিচ্ছে, ওদের উদ্ধত ও উন্মত্ত কামড়ে অনেক মেয়ের স্তনসহ বক্ষের মাংস উঠে আসছিল, মেয়েদের গাল, পেট, ঘাড়, বক্ষ, পিঠের ও কোমরের অংশ ওদের অবিরাম দংশনে রক্তাক্ত হয়ে গেল। যে সকল বাঙ্গালী যুবতী ওদের প্রমত্ত পাশবিকতার শিকার হতে অস্বীকার করলো দেখলাম তৎক্ষণাৎ পাঞ্জাবী সেনারা ওদেরকে চুল ধরে টেনে এনে স্তন ছোঁ মেরে টেনে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে যোনি ও গুহ্যদ্বারের মধ্যে বন্দুকের নল, বেয়নেট ও ধারালো ছুরি ঢুকিয়ে দিয়ে সেই বীরাঙ্গনাদের পবিত্র দেহ ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল। অনেক পশু ছোট ছোট বালিকাদের উপর পাশবিক অত্যাচার করে ওদের অসার রক্তাক্ত দেহ বাইরে এনে দুজন দু পা দু দিকে টেনে ধরে চড়চড়িয়ে ছিঁড়ে ফেলে দিল, আমি দেখলাম সেখানে বসে বসে, আর ড্রেন পরিস্কার করছিলাম, পাঞ্জাবীরা শ্মশানের লাশ যে কোন কুকুরের মত মদ খেয়ে সবসময় সেখানকার যার যে মেয়ে ইচ্ছে তাকেই ধরে ধর্ষণ করছিল। শুধু সাধারণ পাঞ্জাবী সেনারাই এই বীভৎস পাশবিক অত্যাচারে যোগ দেয় নাই, সকল উচ্চ পদস্থ পাঞ্জাবী সামরিক অফিসাররাই মদ খেয়ে হিংস্র বাঘের মত হয়ে দুই হাত নাচাতে নাচাতে সেই উলঙ্গ বালিকা, যুবতী ও বাঙ্গালী মহিলাদের উপর সারাক্ষণ পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ কাজে লিপ্ত থাকতো। কোন মেয়ে, মহিলা, যুবতীকে এক মুহুর্তের জন্য অবসর দেওয়া হয় নাই, ওদের উপর্যুপরি ধর্ষণ ও অবিরাম অত্যাচারে বহু কচি বালিকা সেখানেই রক্তাক্ত দেহে কাতরাতে কাতরাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে।



পরের দিন এ সকল মেয়ের লাশ অন্যান্য মেয়েদের সম্মুখে ছুরি দিয়ে কেটে কুচি কুচি করে বস্তার মধ্যে ভরে বাইরে ফেলে দিত। এ সকল মহিলা, যুবতী ও বালিকাদের মির্মম পরিণতি দেখে অন্যান্য মেয়েরা আরো ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তো এবং স্বেচ্ছায় পশুদের ইচ্ছার সম্মুখে আত্মসমর্পণ করতো। যে সকল মেয়ে প্রাণে বাঁচার জন্য ওদের সাথে মিল দিয়ে ওদের অতৃপ্ত যৌন ক্ষুধা চরিতার্থ করার জন্য সর্বতোভাবে সহযোগীতা করে তাদের পিছনে ঘুরে বেড়িয়েছে, তাদের হাসি তামাসায় দেহ দান করেছে, তাদেরকেও ছাড়া হয় নাই। পদস্থ সামরিক অফিসাররা সেই সকল মেয়েদের উপর সম্মিলিতভাবে ধর্ষণ করতে করতে হঠাৎ একদিন তাকে ধরে ছুরি দিয়ে তার স্তন কেটে, পাছার মাংস কেটে, যোনি ও গুহ্যদ্বারের মধ্যে সম্পূর্ণ ছুরি চালিয়ে দিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে ওরা আনন্দ উপভোগ করতো।



এরপর উলঙ্গ মেয়েদেরকে গরুর মত লাথি মারতে মারতে, পশুর মত পিটাতে পিটাতে উপরে হেডকোয়ার্টারে দোতলা, তেতলা ও চার তলায় উলঙ্গ অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। পাঞ্জাবী সেনারা চলে যাওয়ার সময় মেয়েদেরকে লাথি মেরে আবার কামরার ভেতর ঢুকিয়ে তালাবদ্ধ করে চলে যেত। ইহার পর বহু যুবতী মেয়েকে হেডকোয়ার্টারের উপর তলায় বারান্দার মোটা লোহার তারের উপর চুলের সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়। প্রতিদিন পাঞ্জাবীরা সেখানে যাতায়াত করতো সেই ঝুলন্ত উলঙ্গ যুবতীদের কেউ কেউ এসে তাদের উলঙ্গ দেহের কোমরের মাংস বেটন দিয়ে উন্মত্তভাবে আঘাত করতে থাকতো, কেউ তাদের বক্ষের স্তন কেটে নিয়ে যেত, কেউ হাসতে হাসতে তাদের যোনিপথে লাঠি ঢুকিয়ে আনন্দ করতো, কেউ উঁচু চেয়ারে দাঁড়িয়ে উন্মক্ত বক্ষ মেয়েদের স্তনে মুখ লাগিয়ে ধারালো দাঁত দিয়ে স্তনের মাংস তুলে নিয়ে আনন্দে অট্টহাসি করতো। কোন মেয়ে এসব অত্যাচারে কোন প্রকার চিৎকার চেষ্টা করলে তার যোনি পথ দিয়ে লোহার রড ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে তৎক্ষণাৎ হত্যা করা হত। প্রতিটি মেয়ের হাত বাঁধা ছিল, পেছনের দিকে শুন্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। অনেক সময় পাঞ্জাবী সেনারা সেখানে এসে সেই ঝুলন্ত উলঙ্গ মেয়েদের এলোপাতাড়ি বেদম প্রহার করে যেত। প্রতিদিন এভাবে বিরামহীন প্রহারে মেয়েদের দেহের মাংস ফেটে রক্ত ঝরছিল, মেয়েদের কারো মুখের সম্মুখের দাঁত ছিলনা, ঠোঁটের দু দিকের মাংস কামড়ে, টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল, লাঠি ও লোহার রডের অবিরাম পিটুনিতে প্রতিটি মেয়ের আঙ্গুল, হাতের তালু ভেঙ্গে, থেঁতলে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এসব অত্যাচারিত ও লাঞ্চিত মহিলা ও মেয়েদের প্রস্রাব ও পায়খানা করার জন্য হাতের ও চুলের বাঁধন খুলে দেয়া হত না এক মুহুর্তের জন্য। হেডকোয়ার্টারের উপর তলার বারান্দায় এই ঝুলন্ত উলঙ্গ মেয়েরা হাত বাঁধা অবস্থায় লোহার তারে ঝুলে থেকে সেখানে প্রস্রাব-পায়খানা করত- আমি প্রতিদিন সেখানে গিয়ে এসব প্রস্রাব-পায়খানা পরিস্কার করতাম। আমি স্বচক্ষে দেখেছি, অনেক মেয়ে অবিরাম ধর্ষণেরফলে নির্মমভাবে ঝুলন্ত অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করেছে। প্রতিদিন সকালে গিয়ে সেই বাঁধন থেকে অনেক বাঙ্গালি যুবতীর বীভৎস মৃতদেহ পাঞ্জাবী সেনাদেরকে নামাতে দেখেছি। আমি দিনের বেলায়ও সেখানে সে সকল বন্দী মহিলাদের পূতগন্ধ, প্রস্রাব- পায়খানা পরিস্কার করার জন্য সারাদিন উপস্থিত থাকতাম।



প্রতিদিন রাজারবাগ পুলিশ লাইন ব্যারাক থেকে এবং হেডকোয়ার্টার অফিসের উপর তলা হতে বহু ধর্ষিতা মেয়ের ক্ষতবিক্ষত বিকৃত লাশ ওরা পায়ে রশি বেঁধে নিয়ে যায় এবং সেই জায়গায় রাজধানী থেকে ধরে আনা নতুন নতুন মেয়েদের চুলের সাথে ঝুলিয়ে বেঁধে নির্মমভাবে ধর্ষণ আরম্ভ করে দেয়। এসব উলঙ্গ নিরীহ বাঙ্গালী যুবতীদের সারাক্ষণ সশস্ত্র পাঞ্জাবী সেনারা প্রহরা দিত। কোন বাঙ্গালীকে সেখানে প্রবেশ করতে দেয়া হত না। আর আমি ছাড়া কোন সুইপারকেও সেখানে প্রবেশ করতে দেয়া হতো না।



মেয়েদের হাজারো কাতর আহাজারিতেও আমি ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাঙ্গালী মেয়েদের বাঁচাবার জন্য কোন ভুমিকা পালন করতে পারি নাই।



এপ্রিল মাসের দিকে আমি অন্ধকার অন্ধকার পরিস্কার হওয়ার সাথে সাথে খুব ভোরে হেডকোয়ার্টারের উপর তলায় সারারাত ঝুলন্ত মেয়েদের মলমুত্র পরিস্কার করছিলাম। এমন সময় সিদ্ধেশ্বরীর ১৩৯ নং বাসার রানু নামের এক কলেজ ছাত্রীর কাতর প্রার্থনায় আমি অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে পড়ি এবং মেথরের কাপড় পরিয়ে কলেজ ছাত্রী রানুকে মুক্ত করে পুলিশ লাইনের বাইরে নিরাপদে দিয়ে আসি। স্বাধীন হওয়ার পর সেই মেয়েকে আর দেখি নাই।



১৯৭১ সনের ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী বাংলাদেশ মুক্ত করার পূর্ব পর্যন্ত পাঞ্জাবী সেনারা এসকল নিরীহ বাঙ্গালী মহিলা, যুবতী ও বালিকাদের উপর এভাবে নির্মম-পাশবিক অত্যাচার ও বীভৎসভাবে ধর্ষণ করে যাচ্ছিল। ডিসেম্বরের প্রথম দিকে মিত্রবাহিনী ঢাকায় বোমাবর্ষণের সাথে সাথে পাঞ্জাবী সেনারা আমাদের চোখের সামনে মেয়েদের নির্মমভাবে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। রাজারবাগ হেডকোয়ার্টার অফিসের উপর তলায়, সমস্ত কক্ষে, বারান্দায় এই নিরীহ মহিলা ও বালিকাদের তাজা রক্ত জমাট হয়েছিল। ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী রাজধানীতে বীরবিক্রমে প্রবেশ করলে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সকল পাঞ্জাবী সেনা আত্মসমর্পণ করে।



টিপসহি/-

রাবেয়া খাতুন

১৮-২-৭৪


।। ৪৮ ।। (মুল বইতে এখানে ৪৮ লেখা হয়েছে)
মোহাম্মদ আবু নূর,
শিক্ষক, সিদ্ধেশ্বরী হাই স্কুল,
ঢাকা।



আমি সিদ্ধেশ্বরী হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক। একদিন ভারতে যাওয়ার ব্যাপারে স্কুল থেকে কিছু পাওনা টাকা তুলতে গেছি। এমন সময় পাঞ্জাবী পুলিশের একটি দল আমাকে ও আমার বন্ধু সহকর্মী নজমুল হোসেনকে ধরে নিয়ে রাজারবাগ চলে যায়। সেখানে আমাদের অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তারপর তারা আমাদের টাকা-পয়সা, ঘড়ি ইত্যাদি ছিনিয়ে নিয়ে নেয়। হ্যান্ডকাফ পরিয়ে ওপরে নিয়ে গিয়ে মাটিতে বসিয়ে রাখে এবং মাঝে মাঝে চড় থাপ্পড় দিতে থাকে। সেখান থেকে আমাদেরকে রমনা থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। রমনা থানায় লকআপে থাকার সময় সেখানে আর অনেক ছেলেকে অত্যাচারে জর্জরিত অবস্থায় দেখতে পাই।



ঘন্টাখানেক পর আমাদেরকে লকআপ থেকে বারান্দায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে প্রথমে আমার সহকর্মীর উপর দৈহিক পীড়ন করা শুরু হয়। তাঁকে বেতের মোটা লাঠি দিয়ে অমানুষিকভাবে প্রহার করা হয়। তার পা মুষড়ে ফেলা হয়। কিন্তু তিনি এরপরও কোন গুপ্ত খবর দিতে অস্বীকার করেন। তারপর শুরু হয় আমার পালা। আমাকে তারা নিদারুন লাঠিপেটা করে এবং আমার পা-ও তারা মুষড়ে ফেলে। কিন্তু আমিও কোন গোপন কথা বলতে সম্মত হইনি।



ঘণ্টা খানেক পর একজন ডি,এস,পি এসে আমাদেরকে আবার রাজারবাগ পুলিশ লাইনে নিয়ে যায়। সেখানে অন্যান্য আরো অনেকের সঙ্গে আমাদেরকে ২৪ দিনের জন্য বন্দী করে রাখা হয়। প্রথম দিন রাতে তারা কোন এক পিতা ও তার পুত্রকে একই সঙ্গে উলঙ্গ করে ঐ অবস্থায় সবার সামনে সারারাত দাঁড় করিয়ে রাখে এবং মারধোর করে। আমাকে ও অন্যান্য সবাইকে তারা সকালে, দুপুরে ও সন্ধ্যায় নিয়মমাফিক মারধোর করতো ও জোর করে জবানবন্দী আদায় করে নিত। তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে আমরা সবাই সত্যকে গোপন করে যেতাম। পাঞ্জাবী পুলিশেরা ছাড়াও পাক সেনা বা ই,পি,সি,এ,এফ যারাই আসত তারাই একবার করে এসে আমাদের ধোলাই করে যেত। অনেকেই প্রহারের ফলে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলত। মাঝে মাঝে মধ্যরাতে এসে ঘুম থেকে উঠিয়ে তারা নির্যাতন চালাত। ওরা নিয়মিত আমাদেরকে কিছু খেতে দিত না। তবে মাঝে মাঝে তাদের উচ্ছিষ্ট তারা আমাদের খেতে দিত। বিশেষ করে মারধোর করার সময় পানি চাইলে তারা পানি খেতে দিত না। উল্লেখ করা যেতে পারে মাঝে মাঝে ভিখিরি ছেলেরা বিভিন্ন জায়গা থেকে খাবার ভিক্ষে করে আমাদের দিয়ে যেত।



একদিন ওরা আমার দুই হাত বেঁধে ওপরের দিকে ঐ অবস্থায় একনাগাড়ে ৪৮ ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখে। বাঁধন খুলে দেয়ার পরপরই আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমার পা ভীষন রকম ফুলে যায় এবং সাধারণভাবে চলাফেরা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি।



একদিন কোন এক বন্দীকে তারা পিটিয়ে মেরে ফেলে। তারপর মৃতদেহ বস্তায় পুরে তারা নিয়ে যায়। ওখানে একটা ছেলেকে পিঠমোড়া করে সারাদিন বেঁধে রাখে ফলে তার পচনক্রিয়া আরম্ভ হয়। ঐ অবস্থায় পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।



একদিন সকালে পাঞ্জাবী পুলিশ এসে আমাকে বন্দুকের বাঁট দিয়ে পিটাতে শুরু করে, তখন আমার পরনে শুধু একটা জাঙ্গিয়া ছিল এবং হাত উপরের দিকে বাঁধা অবস্থায় ছিল। সে অবস্থায় একজন মিলিটারী অফিসার, ডি,এস,পি,আর,আই এবং কয়েকজন পুলিশ এসে আমাকে ঘিরে ফেলে, তারা প্রত্যেকেই আমার উপর কিল, ঘুষি, চপেটাঘাত, লাথি এবং থাপ্পড় চালাতে থাকে। আমার বুকের উপর একজন একটা রিভলবার ধরে তাদের ইচ্ছেমত স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করে। কিন্তু আমি কোন গোপন তথ্য প্রকাশ না করলে তারা আরো কিছুক্ষণ মারধোর করে চলে যায়।



একদিন সকালে পাঞ্জাব পুলিশের একজন ডি,এস,পি (অল্প বয়স্ক) দেখতে আসে। তার সাথে কথা বলার জন্য দু-এক মিনিট কথা বলার জন্য অনুমতি চাই এবং সে এতে রাজী হয়। তাকে আমি প্রথমে বলি “শিক্ষার দিক থেকে তুমি আমার চাইতে বেশী নও, কিন্তু কি অবস্থায় আমাদেরকে রেখেছ, তোমরা মানুষ না অন্য কিছু, আমাদের বিরুদ্ধে যদি কোন অভিযোগ থাকে তা তুমি তদন্ত কর এবং আদালতে বিচার দাও। তা না হলে এভাবে আমাদেরকে রাখার কোন অধিকার তোমাদের নেই”। আমার এ কথা শুনে ভীষণ রেগে যায় এবং চিৎকার করতে থাকে। আমাকে সে একটা ছেলের পরিচয় জিজ্ঞাসা করে। আমি বললাম যে ছেলেটির নাম আমি শুনেছি তবে চিনি না। এরপ সে চলে যায়, ঐ দিনই সন্ধ্যার সময় আমাকে বেদমভাবে প্রহার করা হয়। যে ঘরে আমাদের উপর অত্যাচার চালানো হত সেখান থেকে পরে আমাদেরকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়। এখানে দুইজন পাঞ্জাবী পুলিশ মাঝে মাঝে আমাদেরকে খাবার দিয়ে যেত। সিগারেট কিনে এনে দিত, তারা আমাদের মারধোর করতো না। এদের সাহায্যে আমি হাবিব ব্যাংকে (শান্তি নগর শাখা) এক বন্ধুর কাছে ঝাড়ুদারের মারফত একটা চিঠি পাঠাতে সক্ষম হই। আমার বন্ধু ঐ ঝাড়ুদারের কাছে আমার জন্য দশটি টাকা পাঠিয়ে দেয় এবং বন্ধু বান্ধবদেরকে আমার খবর পৌছে দেয়। ছাড়া পাবার ৭/৮ দিন আগে থেকে আমাকে বলা হয় যে টাকা দিলে আমাকে ছেড়ে দেয়া হবে। আমার চেক বইটি (তল্লাশী করে তারা নিয়েছিল) আমার কাছে নিয়ে আসে এবং দু’হাজার টাকা চেক সই করে দিতে বলে। আমি তাদের শ পাঁচেক টাকা দিয়ে রাজি হই। শেষ পর্যন্ত তারা ৬০০ টাকার একখানা চেক সই করিয়ে নেয়, আমাদেরই একজন বন্দীকে নিয়ে টাকা উঠিয়ে নিয়ে আসে। সে দিনই বিকালে আমাকে ছেড়ে দেয়া হয় এবং আরো আটশ টাকা দিতে বলে। আমি পালিয়ে যাব এই ভয়ে একজন পুলিশ আমার পিছনে লাগিয়ে দেয়। পরেরদিন আমি আমার বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদেরকে দিয়ে আসি।



দীর্ঘদিনে বন্দীশিবিরে অত্যাচার ও নির্যাতনের চিহ্ন বহন করে অবশেষে বাড়ী ফিরে যাই। এখনো আমি পুরোপুরি সুস্থ্য হয়ে উঠি নি এবং অস্বাভাবিক জীবনযাপন করছি।



স্বাক্ষর/-

মোঃ আবু নুর

৪-৪-৭৩










।। ১৮ ।।
মোহাম্মদ আলী নুর চোধুরী,
প্রধান শিক্ষক, ঘোড়াশাল হাই স্কুল।



১লা ডিসেম্বর ১৯৭১। সকাল ৫টায় রেলগাড়ী করে প্রায় ৫০/৬০ জন সৈনিক সাথে একজন মেজরসহ ন্যাশনাল জুট মিল (ইজব নগর, ঘোড়াশাল, ঢাকা) ঘিরে ফেলে। তখন অনেকেই নিদ্রায় মগ্ন। মিল ছিল রমজান উপলক্ষে ছুটি। বিশেষ করে মিলের স্টাফের লোকজনই সেখানে তখন ছিলেন। ঘোড়াশাল সেতুর পশ্চিম পাশে গাড়ী থামিয়ে মিছিল সহকারে প্রথমত গুলি করতে করতে পাক বাহিনী মিলে প্রবেশ করে। গুলির শব্দ শুনে মিলের আশেপাশের লোকজন দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে। কিন্তু পাক বাহিনী ওদিকে কোন দৃষ্টিপাত করে নি। রাস্তার পাশে যে সব ঘরবাড়ী ছিল সেগুলিতে অগ্নিসংযোগ করে মাত্র। গোলাগুলির শব্দ শুনে মিলের প্রত্যেকে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। মিলের সহকারী ম্যানেজার শহীদ আবু তালেব পাক বাহিনীর সাথে একত্র হয়ে মিলের সবাইকে সান্ত্বনা সহকারে ডেকে আনেন। অনুমান স্টাফ দেড়শত লোক ছিল এবং তাদের পরিবার পরিজনসহ ৫০০ লোক। মেজর সবাইকে ডেকে শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম পাড়ে নিয়ে যায়। চক্ষু লাল করে ম্যানেজার সাহেবকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এখানে মুক্তিবাহিনী আছে কিনা? এবং স্টাফের সবাইকে মুক্তিবাহিনী বলে মেজর আখ্যায়িত করে। সহকারী ম্যানেজার সাহেব মেজরকে নানাভাবে তাঁর স্টাফ যে মুক্তিবাহিনী নয়, তা বোঝাতে চেষ্টা করেন এবং তার প্রমাণ দেন। ভোর ছয়টা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত উভয়ের মধ্যে এসব কথা কাটাকাটি হয়। শেষ পর্যন্ত মেজর ব্যাপারটা বুঝতে সক্ষম হন। সহকারি ম্যানেজার সাহেবকে স্ব-স্ব কাজে লিপ্ত হতে আদেশ দেন। স্টাফের সবাই নিজ নিজ কাজে চলে যায়। মেজর ও তার অন্যান্য সৈন্যরা মিল প্রদক্ষিন করতে থাকে। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিবাহিনী অনুসন্ধান্ন করা। অবশেষে তারা আবার গাড়ির দিকে রওয়ানা হয়। যখন তারা গাড়ীর দিকে ধাবমান ঠিক সেই মুহুর্তে কোথা হতে কে যেন একে একে দুটি গুলি করে। গুলির শব্দ শুনে মেজর ও অন্যান্য সৈনিকরা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে এবং পুনরায় মিলের দিকে রওয়ানা হয়। আর কালবিলম্ব না করে অফিসার স্টাফের প্রত্যেকের বাসায় উঠে যাকে যেভাবে দেখেছে সেভাবেই নৃশংসভাবে হত্যা করে। উল্লেখ্য যে, মিলের গেটকিপারসহ অফিসার ও স্টাফের দু’একজন ছাড়া সবাইকে পাক বাহিনী নৃশংসভাবে হত্যা করে। ঠিক সন্ধ্যা ৬টায় তারা ট্রেনে উঠে ঢাকা অভিমুখে চলে যায়।



স্বাক্ষর/-

আলী নুর চৌধুরী

৪-১২-৭৩








।। ১৯ ।।
মিসেস আবু তালেব
স্বামীঃ শহীদ আবু তালেব, এম,এ,
সহকারী ম্যানেজার, ন্যাশনাল জুট মিলস,
ঘোড়াশাল, ঢাকা।



১৯৭১ সালের ১লা ডিসেম্বর একদল খানসেনা অতর্কিতভাবে ঘোড়াশাল ন্যাশনাল জুট মিলস ঘিরে ফেলে এবং মিলের ১০৪ জন বিভিন্ন পদের নিরীহ নিরস্ত্র কর্মচারীকে নির্মমভাবে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে এল,এম,জির ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে। শহীদ আবু তালেব তাদের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন। তিনি দিনাজপুরে ঠাকুরগাঁ মহকুমার ধাকদনপুর গ্রামের অধিবাসী ছিলেন এবং জনাব আহমদ উদ্দিন আহমেদের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন এবং ন্যাশনাল জুট মিলের সহকারী ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি পরোক্ষভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধে সহায়তা দান করেন এবং বহু জনহিতকর কাজ সম্পাদন করেন। তিনি দিনাজপুর জেলায় চিরিরবন্দর থানার নওখৈর গ্রামে “নবোদয়” নামে একটি পাঠাগারও স্থাপন করেন। তাছাড়া তার বড় পরিচয় তিনি ন্যাশনাল জুট মিল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন এবং একজন দক্ষ ও জনপ্রিয় পরিচালক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। মাত্র ৩২ বছর বয়সে বর্বর পাক সেনাদের হাতে তাঁর প্রাণ হারাতে হয়। মৃত্যুকালে স্ত্রী ও দুই কন্যা রেখে যান। মৃত্যুর পূর্বমুহুর্তে তিনি বারবার পাক সেনাদের কাছে আবেদন জানান- “মারতে যদি হয় আমাকে মার, আমার কর্মচারীদেরকে মের না”। যেহেতু তিনি মিলটিকে গড়ে তোলেন, সেহেতু তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল মৃত্যুর পর যেন তাঁকে সেখানেই কবরস্থ করা হয়। কিন্তু তার শেষ ইচ্ছা পূর্ণ হয়নি।

স্বাক্ষর/-

মিসেস আবু তালেব

২০-১১-৭৩


।। ২০ ।।
মোহাম্মদ মাহমুদুল আশরাফ
গ্রাম ও পোঃ ঘোড়াশাল
কালীগঞ্জ, ঢাকা।



নভেম্বর মাসের ১৭ তারিখ ঘোড়াশাল স্টেশনে মিলিটারী ক্যাম্প থেকে ৫০/৫৫ জনের একটি দল ভোর ৬ টায় ষ্টেশনের দক্ষিণ দিকের দু’তিনটা পথ দিয়ে খিলপাড়া ও আটিয়া গ্রামের দিকে অগ্রসর হয়। আমি ঘোড়াশাল থেকে তার একদিন পুর্বে বৈয়ম গ্রামে চলে যাই। পাক বাহিনী প্রথমে খিলপাড়া গ্রামে প্রবেশ করে। খিলপাড়া গ্রামের জনৈক দোকানদার ইসলামের সাথে পাক বাহিনী সাক্ষাত কর। বিশেষ করে উল্লেখ্য যে, পাক বাহিনী পূর্বেই ইসলামকে দোকানদার হিসেবে চিনত। পাক বাহিনী ইসলামকে সাহায্য করতে বলে। উপায়ন্তর না দেখে ইসলাম বাধ্য হল পাক বাহিনীর সাহায্য করতে। এরপর শুরু হয় পাক বাহিনীর ধ্বংসলীলা। একের পর এক বাড়ী ধ্বংস করতে থাকে এবং লোকজনদেরকে এক এক করে গুলি করে হত্যা করে। প্রকাশ, ইসলাম একজন ধর্মভীরু লোক। তিনি কোরআন শরীফ পাঠ করছিলেন। হয়তবা অনেক লোক পাক বাহিনীর ভয়ে পালাচ্ছে। সেই মুহূর্তে পাক বাহিনী গুলি করে ওখানেই শেষ করেছে। এমনকি শিশু, নারী-পুরুষ কেউই তাদের নৃশংস হত্যা হতে নিস্তার পায় নি। হত্যার সাথে সাথে অগ্নিসংযোগ চালিয়ে যায়। এত মর্মান্তিক ধ্বংসলীলাকে তৈমুরের ধ্বংসলীলার সাথে তুলনা করা যায়।



এমনিভাবে দু’গ্রামের প্রায় ২০০ নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে। অনেক লোক রাস্তায়, কেউ ঘরে আবার কেউ সেতুর নীচে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। পাক বাহিনীর এই অভিযান প্রায় ৮ঘন্টা ধরে চলে। পাক বাহিনীর সাহায্যকারী ইসলাম তাদের এ অপকার্যে সাহায্য করেছিল। যখন পাক বাহিনী দেখলো তাদের সাহায্যের আর প্রয়োজন নেই তখন পাক দস্যুরা ইসলামকেও হত্যা করে। প্রায় ২০০ মৃতদেহের মধ্যে জনগণ ২ জনের মৃতদেহকে সমাহিত করেছিল।



ঘোড়াশাল রেলষ্টেশনে পাক বাহিনীর একটা ক্যাম্প ছিল। দৈনন্দিন খাওয়ার যাবতীয় জিনিসপত্র গ্রামের নিরীহ লোকদের নিকট হতে জোর করে নিয়ে যেত। পাক পশুরা তাদের পশুত্ব চরিতার্থ গ্রামের যুবতী মেয়েদের উপর মাঝে মাঝে পাশবিক অত্যাচার চালাত। সত্যি কথা বলতে কি পাক বাহিনী সমগ্র ঘোড়াশাল গ্রামে একটা সন্ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে। ঘোড়াশাল বাজার বন্ধ হয়ে যায়, স্কুলে কোন ছাত্র আসত না। গ্রাম প্রায় জনশুণ্য ছিল। যদিও দু’একজন বাঙ্গালী দেখত, তাদের ধরে নিয়ে যেত কাজ করার জন্য। তখন মনে হতো আমার জীবনের মুল্য এক পয়সাও নয়। হঠাৎ একদিন পাক বাহিনী আমাকে এবং আর অনেক লোককে ধরে ফেলে। মুসলমান ছিলাম বলে বেঁচে যাই।



স্বাক্ষর/-

মোঃ মাহমুদুল আশরাফ


।। ২১ ।।
শাহ মোহাম্মদ ফরিদ
ডি,সি, টাঙ্গাইল।



গোয়ালন্দের এস,ডি,ও থাকাকালে পাক বাহিনী আমাকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেনা নিবাসে আটক রাখে। তারপর আমাকে ৩রা জুন ১৯৭১ সাল পর্যন্ত জয়দেবপুরে ভাওয়াল রাজার বাড়ীতে বন্দী রাখে। এই সময় নানা প্রকার শারীরিক অত্যাচারও করা হয়।



জুনের ৪ তারিখে আবার ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে একদিনের জন্য রাখে। সেই রাতে আমার উপর অনেক অত্যাচার করা হয়। পরেরদিন আমাকে সেকেন্ড ক্যাপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ২১ শে সেপ্টেম্বর অবধি বন্দী রাখা হয়। এ সময় আমাকে নানা প্রকার শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার এবং প্রশ্নোত্তর করা হয়।



৩রা সেপ্টেম্বর তারিখে বিভিন্ন অভিযোগে সম্বলিত চার্জশীট দেওয়া হয়।



২১শে সেপ্টেম্বর তারিখে আমাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে বাঙ্গালী কর্মচারীরা আমাকে সকল প্রকার সাহায্য করে এবং যথাসাধ্য আরাম আয়েশে রাখার চেষ্টা করে। আমার সাথে অনেক সরকারী কর্মচারীদের মধ্যে ফরিদপুরের তদানীন্তন জেলা প্রশাসক (বর্তমানে রেজিস্ট্রার, কো-অপারেটিভ সোসাইটি) জনাব আ,ন,ম ইউসুফ, মাদারীপুরের মহকুমা প্রশাসক সৈয়দ রেজাউল হায়াত (বর্তমানে ঢাকার ডি,সি) বন্দী ছিলেন। আমরা সবাই বিচারাধীন আসামী ছিলাম।



১৭ই ডিসেম্বর শুক্রবার সকালে আমরা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসি। গোয়ালন্দে আমার হুকুমে পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধে কুষ্টিয়া ৩০-৩১শে মার্চ ১৯৭১ আছমত ও কুদ্দুস নামে গোয়ালন্দ মহকুমার দু’জন আনসার শহীদ হয়। গোয়ালন্দে ঘাটে ২১শে এপ্রিল পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধে ফকির মহিউদ্দিন নামে আর একজন আনসার শহীদ হয়। এছাড়াও তিনজন আনসার কুষ্টিয়া যুদ্ধে আহত হয়। তাদের নাম আয়িউর, রব ও জিয়াউদ্দিন। গোয়ালন্দ মহকুমার আর একজন আনসার নুরুই ইসলাম আমার সাথে বন্দী ও দীর্ঘ যন্ত্রণাভোগের পর ১৭ই ডিসেম্বর মুক্তি পায়। আমি গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত গোয়ালন্দ মহকুমার দলমত নির্বিশেষে সকল জনসাধারণের এবং সর্বস্তরের সরকারী কর্মচারীদের পূর্ণ সহযোগীতা লাভ করেছিলাম।



স্বাক্ষর/-

শাহ মোহাম্মদ ফরিদ

২৫-৭-৭৩


।। ২২ ।।
শরীফ উদ্দিন আহমদ
গ্রামঃ তারটিয়া
ডাকঘরঃ তারটিয়া ভাতকুড়া
টাঙ্গাইল


“১৯৭১ সনের ১০ই জুন তারিখ বিকাল ৪ টায় টাঙ্গাইল শহরের জেলা সদর রাস্তা হতে ১০ জন রাজাকার ও ৫ জন কুখ্যাত পাক বাহিনীর লোকেরা আমাকে ধরে টাঙ্গাইল জেলা সদরে তাদের আড্ডায় নিয়ে যায়। আমাকে রাস্তায় কোন দিকে তাকাতে দেয়না। আমাকে প্রথমে প্রশ্ন করে ভোট কোথায় দিয়েছ। আমি বলি নৌকায়। এই কথা বলার পর দুজন রাজাকার ও দুইজন পাক সৈনিক আমার উপর হান্টার ও চাবুক দ্বারা প্রহার আরম্ভ করে। তিনটা হান্টার ভাঙ্গার পর অজ্ঞান অবস্থায় আমাকে একটা পচা গন্ধ ভরা কামরায় রেখে চলে যায়। তিনদিন আমাকে কিছু খেতে দেয় নাই। দৈনিক তিনবার করে আমাকে প্রহার করতো। এইভাবে ৫ দিন প্রহার করার পর আমার শরীর ফুলে পচে যায়। এরপর ৬ষ্ঠ দিনে তারা আমাকে কারেন্ট মারে। কারেন্টের ধাক্কা লেগে দুইবার আমি ছিটকে পড়ে যাই। তারপর কি হয়েছে আমি জানিনা। সারাদিন পর অজ্ঞান অবস্থা থেকে জেগে উঠে দেখি আমার সর্বাঙ্গ রক্তাক্ত মেঝে রক্তে ভেসে গেছে। এরপর অত্যাচারের মাত্রা কমে যায়-দৈনিক একবার করে ১৯ তারিখ পর্যন্ত অত্যাচার চলে। ১৯ তারিখের পর আমি প্রায়ই অজ্ঞান অবস্থায় থেকেছি। এর মধ্যে আমি নিজ চক্ষে প্রতিদিন একদল করে লোক রাত্রি বারটার পর আড্ডার উত্তর দিকে নিয়ে যেতে দেখেছি। তাদের আর ফিরতে দেখি নাই। নিয়ে যাওয়ার পর দূর থেকে শুধু প্রতি মুহূর্তে বিকট একটি করে আওয়াজ শুনেছি। এই অবস্থায় ১৭ দিন আমাকে রাখার পর ২৭ তারিখে মৃত মনে করে ফেলে দেয়। আমার একজন পরিচিত লোক মৃতদেহের ভান করে আমাকে রিকশা করে বাড়ীতে পাঠিয়ে দেয়।“



স্বাক্ষর/-

শরীফ উদ্দীন আহমদ






।। ২৩ ।।
কামিনী কুমার দাস
সার্কেল অফিসার (ডেভেলপমেন্ট)
রায়পুরা, ঢাকা



“আমার রায়পুরা থানায় তখন ২২ টি ইউনিয়ন ছিল। বর্তমানে এখানে ২৮ টি ইউনিয়ন। এখানে ৪ লাখ লোকের বাস। রায়পুরা থানায় ২২ টি ইউনিয়নের মধ্যে মেঘনা নদীর দ্বীপ চরে ৫ টি ইউনিয়ন (বর্তমানে অবস্থিত). এলাকা ১৫৪ বর্গ মাইল। অত্র থানার পরিধির মধ্যে ৫টি রেলওয়ে ষ্টেশন আছে। আমার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাক বাহিনীর হেডকোয়ার্টার ছিল। তখন হেডকোয়ার্টার হতে হানাদারদের পৈশাচিক কার্যকলাপ পরিচালনা করত। চর এলাকার দু’টি ইউনিয়ন ও বাকি ইউনিয়নের মধ্যে ১৫টি ইউনিয়নে প্রজ্বলন কার্য চালায় হানাদাররা। যেহেতু রায়পুরা থানার মধ্য ভাগ দিয়ে রেল রাস্তা অবস্থিত। ফলে রেল রাস্তার উভয় দিকের গ্রাম ও অভ্যন্তরেও পাক হানাদাররা বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দেয় ও নৃশংসভাবে জনসাধারণকে হত্যা করে। অত্র থানার বেগম ইউনিয়নে মুক্তিযোদ্ধাদের সহিত পাক বাহিনীর প্রচন্ড সংগ্রাম চলে। ইহা ব্যতীত মীর্জানগর ইউনিয়নের হাঁটুভাঙ্গা ও মোছাপুর ইউনিয়নের রামনগর গ্রামে কয়েকবার পাক বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের খন্ড যুদ্ধ হয়। পাক বাহিনীকে ঘায়েল করা হয় এবং কয়েকজন পাক বাহিনী নিরস্ত্র জনতার হাতে মোছাপুর ইউনিয়নে ও মীর্জানগর ইউনিয়নে ধরা পড়ে। তাদের পরে হত্যা করা হয়। থানা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাক বাহিনীরা ছাউনী খুলে থানা ব্যাপী জনসাধারণের মাঝে সন্ত্রাসের সৃষ্টি করে এবং নিরীহ জনসাধারণকে হত্যা করে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কবরস্থ করে। গণকবর এখনও বিদ্যমান রয়েছে। কয়েকজনকে জোরপূর্বক ধর্মান্তর করে। ধর্মান্তরিত লোককেও বেদম প্রহার করে অত্যাচার করে এবং একজনকে হত্যা করে। থানার প্রত্যেকটি বাজার ওরা লুট করে। এছাড়াও গ্রামে গ্রামে ঢুকে হানাদাররা রাজাকারদের সহায়তায় লুটতরাজ করেছে। থানা পুলিশ ষ্টেশনও হানাদারদের প্রজ্বলন থেকে বাদ পড়েনি।“



স্বাক্ষর/-

কামিনী কুমার দাস

৬/১১/৭৩


।। ২৪ ।।
মোঃ আবদুল হাই; সাং- শাটিয়াচড়া; ডাকঘর-জামুকী; থানা-মির্জাপুর; জেলা-টাঙ্গাইল।



আমাদের গ্রামের নিম্নলিখিত ব্যক্তিগণ শহীদ হয়েছেনঃ-

১| মোঃ জোমারত আলী দেওয়ান।
২| মোঃ নুর বকস
৩| মোঃ শাহ আলম
৪| মোঃ জাহাঙ্গীর আলম
৫| মোঃ হাবিবুর রহমান
৬| মোঃ দুলাল মিয়া
৭| মোঃ আব্দুল হাকিম
৮| বেগম আকতারুজ্জামান
৯| মোঃ লেবু মিয়া
১০| বেগম এখলাস উদ্দিন
১১| মোঃ ইব্রাহিম
১২| আব্দুল হক
১৩| বেগম মাজেম আলী
১৪| মোঃ মোতালেব হোসেন
১৫| মোঃ দুদু মিয়া

গুড়ান গ্রামের শহীদদের নামঃ-
১| মোঃ তোফাজ্জল হোসেন
২| মোঃ চেনু মিয়া
৩| মোঃ আবুল কাশেম
৪| মোঃ নূর উদ্দিন
৫| মোঃ জাহাঙ্গীর মিয়া
৬| মোঃ আবুল মাষ্টার
৭| মোঃ মজিবর রহমান
৮| মোঃ সামছুল হক
৯| বেগম নূরু ইসলাম
১০| আজমত আলী
১১| পান্না মিয়া
১২| বেগম আব্দুল বাকী মিয়া



৩রা এপ্রিল পাক বাহিনী ১৫০ খানা বাড়ীঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। পাক বাহিনীর দালাল আমাদের গ্রামের দুইজন মহিলাকে ধরে পাক শিবিরে নিয়ে তাদের উপর পাশবিক অত্যাচার করে।






।। ২৫ ।।
আবুল কালাম আজাদ
নাগপুর
টাঙ্গাইল



“১৬ই এপ্রিল টাঙ্গাইলে ডি, সি, জালাল আহমেদ সাহেব এবং এস, পি, নুরুজ্জামান সাহেব আসেন লুঙ্গী পরা অবস্থায়। সব ঘটনা বলেন এবং ২/৩ দিন থাকেন আমার ওখানে গোপনে। ওদের বন্ধু ছিলেন টাঙ্গাইলের জনাব আযম খান। ওর সাথে আলাপ করে ঠিক করা হয় কাজে যোগ দেয়ার।

আযম খান গাড়ী নিয়ে এসে নিয়ে গেলেন। এই খবর পাক গোয়েন্দা বিভাগ জেনে ফেলে আযম খানের বাড়ী ঘিরে ফেলে। ওদের তিনজনকে ব্যাপক মারধোর করে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়। ঢাকাতে কয়েকদিন অত্যাচার করে জবানবন্দী নিয়ে তিন জনের জবানবন্দী এক হওয়ায় তাঁরা ছাড়া পান। প্রতিটি স্টেটমেন্টে আমার কথা ছিল। এমনকি আযম খানকে যে চিঠি পাঠিয়েছিলাম সেটিও পাক কর্তৃপক্ষের হাতে গিয়েছিল। আমি সবসময় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত ছিলাম। শেষ পর্যন্ত ওরা মুক্তি পেয়েছেন শুনে শান্তি পেলাম। ডি, সি, ও এস, পি ৩০শে এপ্রিলের দিকে কাজে যোগ দেন।



১০ই মে ডি, সি’র ওখানে সভাতে পাক ক্যাপ্টেনের কথা গুলি বলেন। সভা শেষে ডি, সি সাহেব গোপনে আমাকে ডেকে বললেন সাবধানে থেকো আর হিন্দুদেরকে বলো সাবধানে থাকতে, পূজাগুলো এখন বন্ধ রাখতে বলো- বাঁচলে অনেক কিছু করতে পারবে। আমি সে মোতাবেক রাত ১০টায় পৌছে সবাইকে ডেকে এ খবর দেই; তারা সেই মত সাবধানতা অবলম্বন করে।



ভোর রাতে প্রচুর শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়। বাড়ীতে সবাই কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। দেখলাম পাক সেনারা তিনদিক থেকে নাগপুর আক্রমন করেছে- অত্যাচার চালাচ্ছে। আমরা গেলাম ক্যাপ্টেনের কাছে, ক্যাপ্টেন বলল তুমিই সেই ম্যাজিস্ট্রেট যে জামুর্কীতে আমার বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা পাঠিয়েছিলে। তুমিতো গতকাল হিন্দুদেরকে পালিয়ে যেতে বলেছ। আমি চুপ থাকলাম। ক্যাপ্টেন আমাকে খুব গালাগালি করলো, সে কিছু হিন্দু ধরে এনে বেয়নেট চার্জ করতে লাগলো। আমার খবর শুনে রাতেই অধিকাংশ হিন্দু পালিয়ে গিয়েছিল। ফলে বহু লোক সেদিন বেঁচে যায়।



ক্যাপ্টেন আমাকে এক ঘণ্টা সময় দেয় যে এর মধ্যে ১০০ হিন্দু এনে দিতে হবে। নইলে একটি বুলেট তোমার জন্য বলেই এক চড় মারে। আমি এডামেন্ট হয়ে বেশ কথা কাটাকাটি করলে ক্যাপ্টেন নরম হয়ে আমাকে গাড়ী করে নিয়ে যায়। থানায় গিয়ে দেখলাম ৮/১০ জন নিরীহ লোককে হত্যা করার জন্য রেখেছে। আমি ওরা ঝাড়ুদার বলে ওদেরকে বাঁচাই। ডাঃ কাশেম (ডেন্টিস্ট) এবং ম্যারেজ রেজিষ্টার আমার বিরুদ্ধে টিক্কা খাঁর নিকট দরখাস্ত করেছিল মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে কাজ করায়।



ঐ দিন পাক সেনারা সামনে যাদেরকে পেয়েছে তাকেই গুলি করে হত্যা করেছে। থানায় যেতে গিয়ে রাস্তায় বিভিন্ন স্থানে মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখলাম। বার ঘাট, বাড়ী-ঘর সব ওরা লুট করে নেয়।



আমাকে এক জায়গায় বসিয়ে রেখে ক্যাপ্টেন চলে যায়। আধ ঘন্টা পরে ডেকে পাঠায়। যাওয়ার সাথে সাথে ক্যাপ্টেন আমার বুকে রিভিলবার ধরে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে মারধোর শুরু করে। সেখানে ২০/২৫ জন হিন্দু লোককে শুইয়ে রেখেছে দেখলাম। চারদিকে সিপাইরা বেয়নেট উঁচিয়ে ঘিরে ধরলো। আমার বিরুদ্ধে চার্জ দিল আমার বাড়ী থেকে নাকি ৬ রাউন্ড গুলি ছুড়েছে পাক সেনাদের উপর। অনেক কাকুতি করে ১ মিনিট বলবার সুযোগ পাই। বেশ কিছুক্ষণ পাকিস্তানের পক্ষে মিথ্যা-সত্য বলে ক্যাপ্টেনকে কনভিন্স করি। ক্যাপ্টেন সব শুনে আমার সাথে হ্যান্ডশেক করে ব…

Comments

Popular posts from this blog

Land Registration and Title Issues in Bangladesh: A Practical Guide

Land Registration and Title Issues in Bangladesh: A Practical Guide Land Registration and Title Issues in Bangladesh: A Practical Guide Land registration and clear titles are essential for secure property ownership in Bangladesh. Without proper registration, owners can find themselves facing costly legal battles, and face loss of their valuable investments. It is vital to understand the complexities of the laws and procedures related to land registration in Bangladesh, and how to protect your land rights. This comprehensive guide will provide you with vital insights into the various stages of land registration, starting from the verification of title deeds, to resolving title disputes. It also provides details on the intricacies of the current legal system, so you can protect your interests. ...

অধ্যায় 2: বাংলায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন

বাংলায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন বাংলায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন সুচিপত্র ভূমিকা পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭) ব্রিটিশ শাসনের প্রাথমিক বছরগুলি (1757-1857) 1857 সালের বিদ্রোহ এবং এর প্রভাব প্রয়াত ঔপনিবেশিক সময়কাল (1858-1947) বঙ্গভঙ্গ (1905) ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং ভারত বিভাজন (1947) উপসংহার বাংলায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন (1757-1947) পরিচয় বাংলায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন 1757 থেকে 1947 সাল পর্যন্ত প্রায় দুই শতাব্দী বিস্তৃত ছিল। এই সময়কালে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিবর্তন দেখা যায় যা এই অঞ্চলে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। বাংলার ইতিহাসের জটিলতা এবং ঔপনিবেশিকতার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এর স্থানকে উপলব্ধি করার জন্য এই ঐতিহাসিক যুগকে বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ ...

Ahmedabad Satyagraha in Gujarat (1918)

Ahmedabad Satyagraha in Gujarat (1918) Introduction The Ahmedabad Satyagraha of 1918 marks a significant chapter in India's struggle for independence. It was a labor strike initiated by the mill workers in Ahmedabad, Gujarat, demanding an increase in wages. The strike was not just a protest against economic injustice, but it also symbolized the fight against oppressive colonial rule. The term 'Satyagraha' was coined by Mahatma Gandhi, which translates to 'insistence on truth' or 'soul force'. It was a method of non-violent resistance, and the Ahmedabad Satyagraha was one of the early instances where this method was employed in the Indian independence movement. The Satyagraha in Ahmedabad was a turning point as it marked the beginning of Gandhi's active involvement in Indian politics. It was here that Gandhi first introduced his methodology of peaceful resistance and negotiation as a means to achieve political and social change. The event holds histori...

Comprehensive Guide on Media and Entertainment Law in Bangladesh

Comprehensive Guide on Media and Entertainment Law in Bangladesh Comprehensive Guide on Media and Entertainment Law in Bangladesh Introduction Overview of Media and Entertainment Law Definition and Scope Media and entertainment law encompasses a broad spectrum of legal issues related to the creation, production, distribution, and consumption of media and entertainment content. This includes various sectors such as film, television, music, publishing, digital media, and advertising. The scope of this law covers intellectual property rights, contracts, censorship, licensing, and regulatory compliance. It is essential for protecting the rights of creators, producers, and consumers, ensuring fair use, preventing unauthorized exploitation, and maintaining ethical standards in content creation and distribution. ...

The Memory of the War and the Spirit of Independence

The Memory of the War and the Spirit of Independence The Memory of the War and the Spirit of Independence An in-depth look at how the 1971 Liberation War continues to shape Bangladeshi national identity and political discourse. Table of Contents Introduction: The Echoes of 1971 The War’s Impact on National Identity Preserving History Through Institutions Cultural Echoes of the Liberation War Debates and Interpretations Educational Outreach Conclusion: The Legacy Lives On Introduction: The Echoes of 1971 The year 1971 stands as a pivotal moment in the history of Bangladesh, a time when the indomitable spirit of a people rose against oppression and fought for the right to self-determination. The Liberation War, a nine-month-long struggle, not only led to the birth of a nation but also left an indelible mark on its collective consciousness. The Dawn of Indepe...

Leasing and Renting Property in Bangladesh: A Contemporary Legal Guide

Leasing and Renting Property in Bangladesh: A Contemporary Legal Guide Leasing and Renting Property in Bangladesh: A Contemporary Legal Guide Leasing and renting property is a common practice in Bangladesh, whether for residential or commercial purposes, and requires careful navigation due to the complexity of legal rights and regulations involved. However, without a clear and comprehensive understanding of the legal framework governing these transactions, both landlords and tenants can encounter disputes, and misunderstandings. This comprehensive guide will provide you with an in-depth look into the legal aspects of leasing and renting in Bangladesh. It is designed to provide practical advice, address the most common issues, and ensure you are fully aware of all your rights and responsibilities ...