Skip to main content

খোকা হতে একটি জাতির ত্রাণকর্তা

খোকা হতে একটি জাতির ত্রাণকর্তা
নিউটন মজুমদারঃ




বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা পুরুষ, ইতিহাসের মহানায়ক, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যাঁর জন্ম না হলে হয়তো পাকিস্তান নামক শোষণ যন্ত্রের কবল হতে মুক্তি পেতো না এ জাতি, পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামক একটা স্বাধীন ভূখণ্ডের অভ্যুদয় হতো না কোনদিনই, ইতিহাস থেকে নিঃশেষ হয়ে যেতো বাঙালি নামক একটি জাতিসত্তা আর হারিয়ে যেতো বাংলা নামক একটি ভাষা।




বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান– একজন মহানেতার শাব্দিক নাম। মাতা-পিতার ‘খোকা’, পাড়া-প্রতিবেশীর ‘মিয়া ভাই’, এলাকাবাসীর ‘শেখ সাহেব’, আর অধিকার বঞ্চিত কোটি সংগ্রামী জনতার ‘বঙ্গবন্ধু’, এবং বাঙালি নামক সমগ্র জাতির তিনি ‘পিতা’। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন টুঙ্গিপাড়ার স্বনামধন্য ‘শেখ’ পরিবারে। জনক– শেখ লুৎফর রহমান এবং জননী– শেখ সায়েরা খাতুন। পিতা–মাতার ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয় এবং প্রথম পুত্র। নানা– শেখ আবদুল মজিদ, যাঁর রাখা নামেই তিনি হয়েছিলেন জগৎ বিখ্যাত এবং দাদা ছিলেন শেখ আবদুল হামিদ। মাত্র তের বছর বয়সে তিনি পেয়েছিলেন তাঁর যোগ্যতম সহধর্মিণী রেণু (বেগম ফজিলাতুননেছা)–কে। তাঁর পূর্ব পুরুষদেরই গড়ে তোলা গিমাডাঙ্গা টুঙ্গিপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়েই শেখ মুজিবের হাতেখড়ি এবং তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সেখানেই পড়ালেখা করেন, চতুর্থ শ্রেণিতে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন। তারপর ১৯৩৪ সালে বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হলে তাঁর পড়াশুনায় ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং সুস্থ হওয়ার পর ১৯৩৭ সালে পুনরায় আবার লেখাপড়া আরম্ভ করেন।
নতুন ঠিকানা হয় ‘গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল’ এবং গৃহশিক্ষক হিসাবে লাভ করেন ‘কাজী আবদুল হামিদ’– কে। এই হামিদ সাহেব ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন এবং বহু বছর কারাবরণও করেছিলেন। হামিদ মাষ্টার ‘মুসলিম সেবা সমিতি’– নামক সংগঠন করেছিলেন এবং মুসলমান বাড়ি থেকে ভিক্ষা করে, তিনি এ সংগঠন থেকে গরিব ছেলেদের সাহায্য করতেন। শেখ মুজিব ছিলেন এ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। হামিদ স্যার যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে তিনিই এ সংগঠনের হাল ধরেন। মূলত, তিনি এ সংগঠনের দ্বারাই তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের শুভ সূচনা করেছিলেন এবং একই সঙ্গে তিনি লাভ করেছিলেন নেতৃত্ব এবং মমত্ববোধ। আর তাঁর এই নেতৃত্ব এবং মমত্ব চর্চা পূর্ণতা পায় যখন তিনি কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়তে যান। তিনি যখন বেকার হোস্টেলে থাকতেন, তখন তিনি নানাভাবে গরিব ছেলেদের সাহায্য করতেন। ঠিক এ সময় ১৯৪৩ সালে শুরু হয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, যার বর্ণনা তিনি দিয়েছেন– ‘মা মরে পড়ে আছে, ছোট বাচ্চা সেই মরা মার দুধ চাটছে। কুকুর ও মানুষ একসাথে ডাস্টবিন থেকে কিছু খাবার জন্য কাড়াকাড়ি করছে। ছেলেমেয়েদের রাস্তায় ফেলে দিয়ে মা কোথায় পালিয়ে গেছে। পেটের দায়ে নিজের ছেলেমেয়েকে বিক্রি করতে চেষ্টা করছে। কেউ কিনতে রাজি হয় নাই। বাড়ির দুয়ারে এসে চিৎকার করছে, ‘মা বাঁচাও, কিছু খেতে দাও, মরে তো গেলাম, আর পারিনা, একটু ফেন দাও’। এই কথা বলতে বলতে ঐ বাড়ির দুয়ারের কাছেই পড়ে মরে গেছে।’ কেঁদে উঠলো বঙ্গপিতার বিবেক। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নেতৃত্বে ঝাঁপিয়ে পড়লেন রিলিফের কাজে। নিজের খাবার তুলে দিলেন অনাহারির মুখে। তারপর দুর্ভিক্ষের কাজ শেষে যখন আবার লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন কলকাতা অভিমুখে, ঠিক তখন দেবদূতের মতো পিতার কাছ থেকে পেয়েছিলেন এক অমোঘ মন্ত্র–


Sincerity of purpose and Honesty of purpose


‘থাকলে জীবনে কোনদিন পরাজিত হবা না।’ পিতার দেয়া এ বাণীটি শেখ মুজিব কোনদিনই ভুলে যান নাই।




দুর্ভিক্ষের ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন যোগানোর কাজ শেষ না হতেই পিতার সম্মুখে হাজির হলো এক নতুন যুদ্ধ। এ যুদ্ধ পাকিস্তান সৃষ্টির, ১৯৪৬ সালের মার্চে নির্বাচনে মুসলমানরা পাকিস্তান চায় কি চায় না তা নির্ধারণ করা হবে। মুসলিম লীগের নেতৃত্বে তিনি সমগ্র বাংলায় প্রচার অভিযানে নামলেন। তাঁর ক্ষুর ধার বাগ্মিতা প্রদর্শন করে তিনি পাকিস্তান সৃষ্টির পক্ষে জনমত গড়ে তুললেন। মূলত তখনই শেখ মুজিব মানুষের হৃদয় মন্দিরে স্থান করে নিতে লাগলেন। অবশেষে স্বার্থকতা পেল তাঁর পরিশ্রম ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে জন্ম হলো পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্রের। যে রাষ্ট্র সৃষ্টিতে মুখ্য ভূমিকা ছিল শহীদ সাহেব এবং শেখ মুজিবের। দেশ বিভাগের পরই শুরু হলো প্রচণ্ড হিন্দু–মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এসময় শেখ মুজিব বার বার নিজের জীবন বাজি রেখে হিন্দু–মুসলিম, ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে সকল বিপদাপন্ন মানুষের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদের রক্ষা করেছিলেন। আর এভাবেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের জননেতা শুরু করেছিলেন তাঁর অগ্রযাত্রা।
পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হলো ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ. ডিগ্রী অর্জন করে এসে শেখ মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে ভর্তি হয়েছিলেন এবং ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় হলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছাত্র সমাজের ব্যাপক সাড়া পেলেন। কারণ ছিল একটাই; তিনি যে মানুষকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতে জানেন, মানুষের সুখ–দুঃখ তাঁকে যে গভীরভাবে ভাবায়। তারপর ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি তিনি পাকিস্তান মুসলিম লীগের নোংরা রাজনীতি থেকে নিজেকে বের করে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’। এ সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অধিকার আন্দোলনে সমর্থন দেন এবং সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন। ফলশ্রুতিতে, তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হতে হয় বহিষ্কার। এমন নেতা ইতিহাসে বিরল যিনি ছাত্রজীবনে এত বড় ত্যাগ স্বীকার করলেন নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের খেটে খাওয়া মানুষের দুঃখ লাঘব করার জন্য। কিন্তু তিনি স্থান পেয়েছিলেন এই আপামর শ্রমজীবী মানুষের হৃদয়ে। এবার পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আঘাত করলো বাঙালি জাতির মাতৃভাষার উপর। তারা পাকিস্তানের শতকরা ৫৬ ভাগ জনগোষ্ঠীর মুখের বুলি কেড়ে নিতে চাইলো। স্বয়ং আলী জিন্নাহ সাহেব ঘোষণা করলেন– ‘


Urdhu, Urdhu shall be state language of Pakistan’.


রক্ষকই হয়ে গেল ভক্ষক, কেঁপে উঠলো মুজিবের অন্তরাত্মা। প্রতিবাদের ঝড় উঠলো সমগ্র বাংলায়। ১১ মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি’ দিবস ঘোষণা করা হলো। শেখ মুজিব বিভিন্ন জেলায় ভাষার দাবিতে ছাত্রসভা করতে লাগলেন এবং তাদের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করলেন। মূলত, তাঁর এ প্রচেষ্টায়ই বাংলার সাধারণ ছাত্রসমাজ ভাষার প্রশ্নে জেগে উঠে এবং সৃষ্টি হয়েছিল বায়ান্নর রফিক, শফিক, জব্বার প্রমুখ। কিন্তু দুঃখের বিষয় ঐ বছরই ১১ মার্চ তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর কষ্টোর্জিত স্বপ্নের পাকিস্তানে শুরু হলো তাঁর প্রাপ্তি– কারাজীবন! ক্রমান্বয়ে ভাষা আন্দোলন জোরালো থেকে জোরালোতর হতে লাগলো। আর শেখ মুজিব বন্দী থাকতে লাগলেন নির্জন কারা প্রকোষ্ঠে। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী শুরু থেকেই তাঁকে ভয় করতেন। কারণ তারা হয়তো মুজিবের তেজদীপ্ত সম্ভাবনাকে আঁচ করতে পেরেছিলেন। অবশেষে ভাষা আন্দোলন এবং মুজিবের মুক্তি আন্দোলন ক্রমশ তীব্রতর রূপ ধারণ করলো। এরই ধারাবাহিকতায় এলো ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। বাংলার দামাল সূর্য সন্তানদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হলো। মায়ের মুখের বুলির জন্য প্রাণ দিতে হলো একটা জাতিকে। ফলশ্রুতিতে, ১৯৫৬ সালের পাকিস্তান সংবিধানে বাংলা ভাষা পেয়েছিল একটা স্বীকৃতি।




১৯৫৩ সালে রাজবন্দীদের মুক্তি দিতে আরম্ভ করলো পাকিস্তান সরকার। ইতিমধ্যে ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু হলো। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হলো যুক্তফ্রন্ট, প্রতিপক্ষ মুসলিম লীগ। শেখ মুজিব ছুটে বেড়াতে লাগলেন বাংলার মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। এসময়ই তিনি প্রত্যক্ষ করলেন মানুষের দুঃখ–দুর্দশা, কিন্তু সিক্ত হলেন তাদের অকৃত্রিম ভালোবাসায়। সত্যি নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করলো। শেখ মুজিব বিজয়ী বেশে ঢাকায় ফিরে এলেন, শহীদ সাহেব তাঁকে মন্ত্রিত্ব নেওয়ার অনুরোধ জানালেন। তিনি জবাব দিলেন– ‘আমি মন্ত্রিত্ব চাইনা’। কিন্তু নেতৃবৃন্দ ঠিকই শেখ মুজিবকে মন্ত্রিত্বের আসন দিলেন। কিন্তু যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রীসভা গঠিত হতে না হতেই কেন্দ্রীয় সরকার তা বরখাস্ত করলো এবং শেখ মুজিবকে আবার বন্দি করা হলো। তারপর ১৯৫৮ সালে সমগ্র পাকিস্তানে ইস্কান্দার মির্জা জারি করলেন জরুরি অবস্থা। দীর্ঘায়িত হতে লাগলো শেখ মুজিবের কারাজীবন। পরিবার–পরিজন, মা–বাবা, সন্তান এবং প্রিয় পত্নী থেকে এক বিচ্ছিন্ন জীবন! অবশেষে ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু নিয়ে এলেন বাঙালি জাতির মুক্তি সনদ অগ্নি মন্ত্রণা ‘৬ দফা দাবি’। তৎকালীন পাকিস্তান শাসক আইয়ুব খানের রক্তরাঙা চক্ষুকে উপেক্ষা করে তিনি পাঠ করলেন তাঁর মহামন্ত্র। সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টার ঠিকানা হলো কারা প্রকোষ্ঠ এবং শুরু হলো তাঁর বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র। কিন্তু ষড়যন্ত্রের ভয়ে বাঙালি জাতি কেঁপে উঠলো না, ৬ দফা দাবি আদায়ে তারা তীব্র আন্দোলনে লিপ্ত হয়। ইতিমধ্যে আইয়ুব সরকার শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে দায়ের করলো ইতিহাসের ঘৃণ্যতম ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’। জনগণ কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না তাদের প্রাণপ্রিয় নেতার বিরুদ্ধে এ চক্রান্ত, দুর্বার গতিতে সমগ্র বাংলায় ছড়িয়ে পড়লো আন্দোলন। শত্রুর বুলেট বাংলার দামাল সন্তানদের গতিরোধ করতে ব্যর্থ হলো। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারিতে আইয়ুব খান এ আন্দোলনের তীব্রতায় ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে মামলা প্রত্যাহার পূর্বক পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। ক্ষমতা গ্রহণ করলেন আরেকজন কুচক্রী রক্ত পিপাসু দানব ইয়াহিয়া। ক্ষমতা গ্রহণ করেই তিনি দিলেন এক প্রহসনের নির্বাচন। ১৯৭০ সালের সে নির্বাচনেও আওয়ামীলীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে জেনারেল ইয়াহিয়া ক্ষমতা হস্তান্তর না করে, বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার অভিপ্রায়ে চরম আঘাত হানার নীলনকশা করতে আরম্ভ করলেন। ইয়াহিয়া ৩রা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করে, হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে তা ১লা মার্চ অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি ঘোষণা করেন। ক্ষোভে ফেঁটে পড়ে বাংলার শান্তিপ্রিয় জনগন। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সারাদেশে একযোগে হরতাল পালিত করতে থাকে এবং সমগ্র পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই পটভূমিতেই আসে ৭ মার্চ। ঢাকার রেসকোর্স (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে সেদিন বাঙালি মায়ের অকুতোভয় অমিততেজা বীর সেনানীদের ঢল নেমেছিল। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’– স্লোগানে সেদিন বাংলার আকাশ–বাতাস প্রকম্পিত হয়েছিল। তারই মাঝে এসে দাঁড়ালেন ইতিহাসের এক মহানায়ক, রাজনীতির কবি, স্বাধীন বাংলার স্রষ্টা এবং পাঠ করতে আরম্ভ করলেন বাঙালি জাতির মুক্তির মহাকাব্য–


‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে… আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবে না… তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো রক্ত যখন দিয়েছি, আরো রক্ত দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা।’




এ অমরবাণী ধ্বনি–প্রতিধ্বনি হয়ে বেজে উঠলো সমগ্র বাঙালির শিরা–উপশিরায়, প্রচণ্ডরূপে আঘাত হানলো বাঙালি চেতনায়। বজ্রকণ্ঠের সে অমরবাণী যেন চুম্বকের মতো আকর্ষণ করলো প্রতিটি বাঙালি চেতনায়। অন্যদিকে, কেঁপে উঠলো পাকিস্তানি নরপিশাচগুলোর অন্তরাত্মা। ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে কাপুরুষের দল ২৫ মার্চের কালো রাতে নিরস্ত্র–নিরীহ, শান্তিপ্রিয় ঘুমন্ত বাঙালিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু তাঁর ধানমণ্ডির বাড়ি থেকে বাঙালি জাতির স্বাধীনতার ঘোষণা করেন এবং বাংলার মাটি থেকে পাকিস্তানি শেষ হানাদারটিকে পর্যন্ত নিঃশেষ করে স্বাধীনতার লাল সূর্যটাকে ছিনিয়ে আনতে সমগ্র জাতির প্রতি আহ্বান জানান। এ ঘোষণাটি সঙ্গে সঙ্গে ওয়ারলেস যোগে দেশের সর্বত্র পৌঁছে দেয়া হয়। অতঃপর বীরেশ্বর বীরের বেশে পাকবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন এবং তাঁকে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। বঙ্গবন্ধুকে হারানোর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে বাঙালি হৃদয় আরো কঠোর রূপ ধারণ করে, তারা জাতির পিতার অভয় বাণীতে উজ্জীবিত হয়ে শত্রু ঘাঁটিতে চরম সশস্ত্র আঘাত হানতে থাকে। এভাবেই নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ত্রিশ লক্ষ তাজা প্রাণ উৎসর্গের বিনিময়ে বাংলার দামাল ছেলেরা ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্যকে।
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর আমরা উড়াই আমাদের লাল–সবুজের বিজয় নিশান। পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় হয় বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের। যার পিতা ‘শেখ মুজিবুর রহমান’।


তথ্যসূত্র:
* ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’– শেখ মুজিবুর রহমান
* ‘কারাগারের রোজনামচা’– শেখ মুজিবুর রহমান
* ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’– শেখ হাসিনা
* ‘বাংলা উইকিপিডিয়া’




লেখকঃ কলামিস্ট
সহযোগী সম্পাদক ‘মাসিক তারুণ্য’,
বিএসএস (সম্মান), এমএসএস, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।


Comments

Popular posts from this blog

Land Registration and Title Issues in Bangladesh: A Practical Guide

Land Registration and Title Issues in Bangladesh: A Practical Guide Land Registration and Title Issues in Bangladesh: A Practical Guide Land registration and clear titles are essential for secure property ownership in Bangladesh. Without proper registration, owners can find themselves facing costly legal battles, and face loss of their valuable investments. It is vital to understand the complexities of the laws and procedures related to land registration in Bangladesh, and how to protect your land rights. This comprehensive guide will provide you with vital insights into the various stages of land registration, starting from the verification of title deeds, to resolving title disputes. It also provides details on the intricacies of the current legal system, so you can protect your interests. ...

Leasing and Renting Property in Bangladesh: A Contemporary Legal Guide

Leasing and Renting Property in Bangladesh: A Contemporary Legal Guide Leasing and Renting Property in Bangladesh: A Contemporary Legal Guide Leasing and renting property is a common practice in Bangladesh, whether for residential or commercial purposes, and requires careful navigation due to the complexity of legal rights and regulations involved. However, without a clear and comprehensive understanding of the legal framework governing these transactions, both landlords and tenants can encounter disputes, and misunderstandings. This comprehensive guide will provide you with an in-depth look into the legal aspects of leasing and renting in Bangladesh. It is designed to provide practical advice, address the most common issues, and ensure you are fully aware of all your rights and responsibilities ...

শেখ হাসিনার ১৬ বছরের উন্নয়ন: একটি বিশ্লেষণ (২০০৯-২০২৪)

শেখ হাসিনার ১৬ বছরের উন্নয়ন: এক বিশ্লেষণ (২০০৯-২০২৪) শেখ হাসিনার ১৬ বছরের উন্নয়ন: এক বিশ্লেষণ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ১৬ বছরের উন্নয়নমূলক প্রকল্প ও সামাজিক রূপান্তরের কৌশলগত বিশ্লেষণ (২০০৯-২০২৪) সূচিপত্র (Table of Contents) কার্যনির্বাহী সারাংশ: রূপান্তরের পথরেখা (২০০৯-২০২৪) সংযোগ ও নগর গতিশীলতা (Connectivity and Urban Mobility) স্ব-অর্থায়ন এবং আঞ্চলিক প্রভাব: পদ্মা সেতু ও যমুনা রেল সেতু মহানগরীর আধুনিকীকরণ: মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে ও অন্যান্য প্রকল্প চট্টগ্রাম-কক্সবাজার করিডোর: সুড়ঙ্গ ও বন্দর সুবিধা জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্পায়ন চালক (Energy Security and ...